
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে এক ভয়াবহ নাম শোনা যাচ্ছে, তা হলো হাম আতঙ্ক। গত কয়েক মাসে সারা দেশে এই রোগের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর মিছিল আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষ এখন একে মহামারীর সমতুল্য মনে করছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন হঠাৎ এই হাম আতঙ্ক দেশজুড়ে জেঁকে বসল? এর পেছনে কি আমাদের টিকাদান কর্মসূচীর কোনো গাফিলতি ছিল? বিগত ইউনুসীয় শাসনামলে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা কি এর জন্য দায়ী? চলুন বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক।
এক নতুন বিপদের পদধ্বনি
হাম কোনো নতুন রোগ নয়। তবে গত কয়েক দশকে সফল টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে বাংলাদেশ একে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শত শত শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। পত্রিকাগুলোর শিরোনামে এখন নিয়মিত জায়গা করে নিচ্ছে হাম আতঙ্ক। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। সাধারণ জ্বর-সর্দি ভেবে অনেক অভিভাবক বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু যখন শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এই পরিসংখ্যান কেবল সরকারি হিসাবের। বেসরকারিভাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই যে ভয়াবহ হাম আতঙ্ক, এর শিকড় অনেক গভীরে। রাজধানীর বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিক—সবখানেই আক্রান্তের সারি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে দ্রুতই অন্য শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এটি ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতারই প্রমাণ দেয়।
ইউনুসীয় শাসনামল ও টিকাদান কর্মসূচীর স্থবিরতা
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শান্তির মহাদূত ড. ইউনুসের শাসনামলে হামের টিকাদান কর্মসূচী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল। তিনি শুধু ব্যস্ত ছিলেন মব সন্ত্রাস আর নিজের থলে ভরানোর কাজে ব্যস্ততা নিয়ে। শিশুদের হাম ও অন্যান্য রোগের কর্মসূচি মূলত বন্ধই ছিল বলা চলে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বর্তমানে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব কি তারই ফলাফল? এই হাম আতঙ্ক কি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল? রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের এই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটা স্থিমিত হয়ে পড়েছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশের ভালো কিছুর দিকে একেবারেই দেওয়া হয়নি। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত টিকাদান বা ইপিআই (EPI) কর্মসূচী অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে।
১. টিকা সংকটের নেপথ্যে
বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, দেশের অনেক অঞ্চলে টিকার তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক অভিভাবক শিশুকে টিকা দিতে কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে আসছেন। এই টিকা সংকটই সাধারণ মানুষের মনে হাম আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিয়মিত টিকা না পাওয়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।
২. মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কর্মবিরতি ও সমন্বয়হীনতা
প্রশাসনের রদবদল এবং মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত জটিলতায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা নিশ্চিত করত, তাদের কার্যক্রম এখন সীমিত। ফলে বিশাল এক জনগোষ্ঠী টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। এই শূন্যস্থান পূরণ না হওয়ায় দেশে আজ হাম আতঙ্ক প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
একমাস পেরিয়ে বর্তমান সরকার: প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে গুপ্ত জামাতের আনাগোনা, সাবধানতার এখনই সময়
কেন ছড়াচ্ছে এই মহামারী?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে মুহূর্তেই অনেক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কয়েকটি প্রধান কারণ হলো:
টিকার ডোজ মিস হওয়া: করোনা পরবর্তী সময়ে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিশু টিকার দ্বিতীয় ডোজ পায়নি।
পুষ্টিহীনতা: অর্থনৈতিক মন্দার কারণে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। দুর্বল শরীর খুব সহজেই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।
সচেতনতার অভাব: অনেক অভিভাবক হামকে সাধারণ চর্মরোগ মনে করে ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে সময় অপচয় হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
ভুল তথ্য: সোশ্যাল মিডিয়ায় টিকা নিয়ে নানা অপপ্রচার সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ফলে টিকার প্রতি অনীহা থেকেই হাম আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে।
হামের লক্ষণ: অভিভাবকদের যা জানা জরুরি
ভয় না পেয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। হাম আতঙ্ক দূর করতে হলে লক্ষণগুলো চিনতে হবে:
১. তীব্র জ্বর হওয়া।
২. নাক দিয়ে জল পড়া এবং চোখ লাল হওয়া।
৩. শুকনো কাশি।
৪. তিন থেকে চার দিন পর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া।
৫. খাওয়ার প্রতি অনীহা ও শারীরিক দুর্বলতা।
যদি কোনো শিশুর মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অবহেলা করলে এটি নিউমোনিয়া বা মস্তিস্কের প্রদাহের মতো জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
গণভোটে মেটিকুলাস ডিজাইন: ভোট কাস্টিংয়ের হার ২৪৪% কীভাবে কোথায় থেকে অবতীর্ণ হলো?
মহামারীর জন্য কি কেবল প্রশাসন দায়ী?
ইউনুসীয় শাসনামলে স্বাস্থ্য খাতের কিছুটা শিথিলতা লক্ষ্য করা গেলেও, পুরো দায় কি কেবল সরকারের? বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি পুঞ্জীভূত সমস্যা। দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্নীতি এবং সঠিক ডাটাবেজ না থাকা এর বড় কারণ। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে তদারকির অভাব বিষয়টিকে জটিল করেছে। হাম আতঙ্ক কেবল একটি রোগ নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থার প্রতিফলন। যখন নিয়মিত কর্মসূচী বন্ধ থাকে, তখন ভাইরাসের পুনরুত্থান ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক তাই হয়েছে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
দেশজুড়ে যে হাম আতঙ্ক বিরাজ করছে, তা থেকে মুক্তি পেতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা
সরকারকে অনতিবিলম্বে সারা দেশে টিকাদানের একটি বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। যারা আগে টিকা মিস করেছে, তাদের তালিকা করে টিকা দিতে হবে।
২. টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা
বিদেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে টিকা আমদানি করতে হবে। টিকার কোল্ড চেইন বজায় রাখা এবং তৃণমূল পর্যায়ে তা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরবরাহ ঠিক না থাকলে হাম আতঙ্ক কমানো সম্ভব নয়।
৩. জনসচেতনতা বৃদ্ধি
বেতার, টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। হামের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। গুজব প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. আক্রান্তদের আইসোলেশন
আক্রান্ত শিশুদের অন্তত সাত দিন আলাদা রাখতে হবে। স্কুলে পাঠানো বন্ধ করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া জরুরি।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
বাংলাদেশের গণভোট ২০২৬: আইনি বিতর্ক, রাজনৈতিক সংকট ও জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: আমাদের কি শেখা উচিত?
বর্তমান হাম আতঙ্ক আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য কখনোই অবহেলার বিষয় নয়। শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, স্বাস্থ্য সেবা যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব যেন শিশুদের জীবনের ওপর না পড়ে। যদি সঠিক সময়ে টিকাদান কর্মসূচী সচল রাখা যেত, তবে হয়তো আজ ৯৪ জন শিশুকে অকালে প্রাণ হারাত হতো না। এই মৃত্যুগুলোর দায়ভার এড়ানোর সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও বাস্তবতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিকা দিলে হাম হওয়ার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ কমে যায়। বাংলাদেশে যে হাম আতঙ্ক শুরু হয়েছে, তার প্রধান কারণ হলো হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। টিকাদান কর্মসূচী এক মাস বন্ধ থাকলেও হাজার হাজার শিশু ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইউনুসীয় শাসনামলে ঠিক এই সুযোগটিই ভাইরাসটি পেয়েছে। প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগে ভাইরাসটি জনপদে শিকড় গেড়েছে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সমাধান
পরিশেষে বলা যায়, হাম আতঙ্ক এখন একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। একে কেবল একটি সংক্রমণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সামাজিক অসচেতনতার এক সংমিশ্রণ। ড. ইউনুসের সরকারকে বুঝতে হবে যে, রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোও প্রধান দায়িত্ব। টিকাদান কর্মসূচী পুনরায় পূর্ণোদ্যমে চালু না করলে এই মহামারী আরও প্রাণ কেড়ে নেবে।
হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। গুজব এড়িয়ে শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দিন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। সঠিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই হাম আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রতিটি শিশুর সুস্থ বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত হোক।
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata