বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি: যুদ্ধ না বাধলেও সংকট তৈরি হতো, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আদৌ কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি
বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি: যুদ্ধ না বাধলেও সংকট তৈরি হতো, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আদৌ কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন এবং উদ্বেগ দানা বাঁধছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতা জনজীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর শামসুল আলমের এক বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকট বড় কারণ হলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এই সংকটের মূল উৎস।

এমনকি যদি যুদ্ধ নাও বাধত, তবুও বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি আজ এমন এক সংকটের মুখোমুখি হতো যা এড়ানো কঠিন ছিল। গত কয়েক দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে পরিমাণ লুণ্ঠন এবং দুর্নীতি হয়েছে, তার মাশুল এখন সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। সরকারের সক্ষমতা এবং আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে এখন চারদিকে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

​সংকটের মূলে কেবল যুদ্ধ নয়, কাঠামোগত দুর্বলতা

অনেকে মনে করেন ইউক্রেন-রাশিয়া বা ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার কারণেই দেশে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই ভঙ্গুর ছিল। অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, জ্বালানি খাতে সরকারের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের দীর্ঘ লাইন এবং কালোবাজারে জ্বালানি বিক্রির ঘটনা প্রমাণ করে যে সিস্টেমের ভেতরেই ‘ভূত’ রয়ে গেছে।

তেল বা অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই বলে সরকার দাবি করলেও সাধারণ মানুষ তা পাচ্ছে না। এর মানে হলো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এখন পাহাড় সমান।

​জ্বালানি খাতের লুণ্ঠন ও দায়বদ্ধতার অভাব

গত ১৮-২০ মাস ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কোনো ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়নি। যেও নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তা মূলত লুণ্ঠনমূলক। অধ্যাপক আলমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খাতে অলিগার্ক বাহিনী তৈরি হয়েছে। তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লুণ্ঠনমূলক ব্যয় করা হচ্ছে।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

ঈদযাত্রার দূর্ঘটনায় মৃত্যু: অপ্রয়োজনীয় এই যাত্রায় মৃত্যু কি আদৌ এড়ানো সম্ভব?

যদি এই অপচয় বন্ধ করা যেত, তবে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও সিস্টেম সচল রাখা সম্ভব ছিল। অথচ সরকার দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে। কিন্তু তাতেও ঘাটতি কমছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকায় এখন জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এই আর্থিক দেউলিয়াত্ব বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

​লোডশেডিং ও অন্ধকারের পদধ্বনি

গ্রীষ্মের শুরুতেই লোডশেডিং যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা অভাবনীয়। সরকার পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের কথা বললেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। অধ্যাপক আলম সতর্ক করেছেন যে, যদি এখনই চুরি এবং অপচয় বন্ধ করা না হয়, তবে পুরো দেশ অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এমন যে, সরকার উৎপাদন খরচ জোগাতে পারছে না। বকেয়া বিল পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

২০২৬ সাল নাগাদ যখন বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে, তখন পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে। যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে এই ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের আগেই যে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি ছিল, তা এখন আর গোপন রাখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রেশনিং পদ্ধতির সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি ছিল, কিন্তু সেখানেও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও সংবাদপত্র যা বলছে

আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোও বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন আর্টিকেলে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। বিদেশি ঋণের বোঝা এবং জ্বালানি আমদানিতে ব্যর্থতা দেশটিকে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতেও প্রতিদিন জ্বালানি সংকটের খবর আসছে। তেলের জন্য পেট্রোল পাম্পে মারামারি এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এটি একটি অরাজক পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

দেশের ব্যাংকে টাকা রাখছেন না অতিধনীরা: সংকটে কি আমাদের ব্যাংকিং খাত?

বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের গৃহীত ভিজিজেন্স টিম বা মোবাইল কোর্ট কোনো কাজে আসছে না। কারণ সমস্যার মূলে থাকা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অবৈধ মজুতদারদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও সাধারণ মানুষ ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।

​সরকারের পরিকল্পনা কি যথেষ্ট?

সরকার দাবি করছে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। মোটরসাইকেলে ফুয়েল কার্ড ব্যবস্থা বা তেলের রেশন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা দেশে নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অনেকটা নিষ্ক্রিয়।

বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে ড্রাস্টিক কিছু সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল। যেমন—লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির তেলের খরচ সীমিত করা। কিন্তু সরকার নিজের লোকদের ওপর হাত দিতে ভয় পাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকেই ত্যাগের শিকার হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে কেবল আশ্বাস দিয়ে সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

​অর্থনৈতিক অভিঘাত ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাতায়াত ও পণ্যমূল্যের ওপর। ডিজেলের দাম বা সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে পুরো বাজার ব্যবস্থায় আগুন লাগে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে উঠেছে। অধ্যাপক আলমের মতে, সংকটের সময় বড়লোকদের এসি এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা উচিত ছিল।

কিন্তু তা না করে প্রান্তিক মানুষের বিদ্যুতে কোপ দেওয়া হচ্ছে। কৃষিকাজে সেচের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দা অনিবার্য। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে কয়লা বা গ্যাস কিনতে না পারাটা সরকারের চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

​ভবিষ্যৎ পথচলা ও সংকট উত্তরণ

সংকট থেকে বের হতে হলে সবার আগে চুরি এবং অপচয় বন্ধ করতে হবে। অধ্যাপক আলমের ভাষায়, ‘চোরের বিচার’ আগে করতে হবে। যারা বিদ্যুৎ খাতকে নিজেদের আয়ের উৎস বানিয়েছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

তথ্য গোপন না করে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে আনতে হবে। সরকার যদি মনে করে যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সব দায় এড়ানো যাবে, তবে তারা ভুল করছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে হলে বিকল্প জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে এবং সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং বণ্টন করলে অন্তত মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমত।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

আফগান বিচারব্যবস্থায় বৈষম্য: অপরাধ নয়, অপরাধীর ‘শ্রেণি’ দেখে নির্ধারিত হবে শাস্তি

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং সংবেদনশীল। যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল বিদ্যমান ক্ষতের ওপর নুনের ছিটা দিয়েছে মাত্র। মূল ক্ষতটি তৈরি হয়েছে গত দেড় দশকের নীতিগত ভুল এবং দুর্নীতির কারণে। অধ্যাপক শামসুল আলমের বিশ্লেষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সমস্যার সমাধান আমাদের ভেতরেই আছে।

কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি কেবল তখনই উন্নত হবে যখন সরকার ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে বড় করে দেখবে। লুণ্ঠন বন্ধ না হলে কোনো বিদেশি ঋণ বা সাময়িক পরিকল্পনা দেশের অন্ধকার দূর করতে পারবে না। সময় এসেছে কঠোর হাতে দুর্নীতি দমনের, অন্যথায় বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে যা কারোরই কাম্য নয়।

দেশের সার্বিক এই পরিস্থিতিতে আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *