
সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে হৈ হট্টগোল আর ওয়াক আউটের মধ্য দিয়ে। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি।
নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ নানান ঘটনা ও নাটকিয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী দল জামাত এবার বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের সাথে আছে কতিপয় অর্বাচীন, ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামক সন্ত্রাসীদের দল- এনসিপি। যারা প্রথমবারের মতো নির্বাচনে এসে বাংলাদেশের সাধারণ গণমানুষ কর্তৃক তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত আজকের সংসদের প্রথম অধিবেশনের সংবাদ বিশ্লেষণ পূর্বক আমরা লিখেছি এই আর্টিকেল।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম। তবে নতুন সংসদ হলেও পুরনো সেই চিরচেনা দৃশ্যপট আবারও ফিরে এসেছে। সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে দেশবাসীর মধ্যে ছিল ব্যাপক কৌতুহল। কিন্তু অধিবেশনের শুরুতেই হট্টগোল এবং বিরোধী দলের ওয়াকআউট সংসদীয় রাজনীতির পুরনো সেই তিক্ত স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই সংসদ কি পারবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে? নাকি রাজপথের লড়াই এবার সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
সংসদের প্রথম অধিবেশন: নতুন স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ
অধিবেশনের শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক আলোচনা থাকলেও অধিবেশনের শুরুটা ছিল বেশ উত্তপ্ত। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি তার বক্তব্যে সংসদকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নন। আপনারা এই দেশের জনগণের প্রতিনিধি।” তার এই আহ্বানে ঐক্যের সুর থাকলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও উত্তপ্ত সংসদ
সংসদের প্রথম অধিবেশন প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদে ভাষণ দিতে দাঁড়ালে বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন। তারা বিভিন্ন প্লাকার্ড হাতে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় এমন হট্টগোল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব একটা দেখা যায়নি।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপথ: চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র?
বিরোধী দলের অভিযোগ, এই সরকার ও রাষ্ট্রপতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়েছেন। তাহলে এখন তার বিরোধিতা করার যৌক্তিকতা কী? এই পাল্টা-পাল্টি যুক্তিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন হয়ে ওঠে বেশ উত্তপ্ত।
বিরোধী দলের প্লাকার্ড হাতে প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট
সংসদীয় গণতন্ত্রে ওয়াকআউট একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক ভাষা। তবে সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালেই এমন দৃশ্য দেখা যাবে তা অনেকেই ভাবেননি। রাষ্ট্রপতি যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্লাকার্ড উঁচিয়ে প্রতিবাদ করেন। এরপর এক পর্যায়ে তারা সম্মিলিতভাবে সংসদ কক্ষ ত্যাগ বা ওয়াকআউট করেন।
বিরোধী দলের দাবি, সংসদে তাদের কথা বলার সুযোগ সংকুচিত করা হচ্ছে। তবে সরকারি দলের মতে, এটি কেবলই সংসদকে অকার্যকর করার একটি অপচেষ্টা। জামায়াত ও এনসিপি-র এই ভূমিকাকে ‘সংসদ ও রাষ্ট্র অকার্যকরের পথে হাঁটা’ বলে অভিহিত করেছেন রাজনৈতিক নেতা রাশেদ খাঁন।
প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য
অধিবেশনের উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য পেশ করেন। তিনি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নন।” প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় সংসদ সদস্যদের দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত: পরবর্তীতে কে ধরবেন ইরানের মাস্তুল, বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, “দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাই আমার রাজনীতি।” তিনি আহ্বান জানান যেন সংসদকে অহেতুক হট্টগোলের কেন্দ্রে পরিণত না করে গঠনমূলক আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই তিনি ইতিবাচক রাজনীতির ধারা শুরুর তাগিদ দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দলের ওয়াকআউট নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কঠোর সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, বিরোধী দলের এই আচরণ দ্বিচারিতার শামিল। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, যারা শপথ নিয়ে সংসদে এসেছেন, তারা সংসদীয় রীতি মেনেই কাজ করবেন এটাই প্রত্যাশিত। সংসদের প্রথম অধিবেশন এভাবে বর্জন করা বা হট্টগোল করা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সংসদ কি অকার্যকরের পথে?
সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাশেদ খাঁনের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা মনে করছেন, বিরোধী দল যেভাবে শুরু থেকেই অসহযোগিতা করছে, তাতে সংসদ ও রাষ্ট্র অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলো যদি সংসদের ভেতরে কেবল প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থ রক্ষা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একটি কার্যকর সংসদ পেতে হলে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই সহনশীল হতে হবে।
বিদেশের গণমাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ
বাংলাদেশের সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে স্পিকার হিসেবে মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদের নিয়োগ এবং বিএনপির বিরোধী দলীয় ভূমিকা নিয়ে বহিবিশ্বের নজর রয়েছে।
আল জাজিরা, বিবিসি এবং রয়টার্সের মতো সংবাদ সংস্থাগুলো বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে সংসদের এই হট্টগোল ও ওয়াকআউটের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, সংসদের প্রথম অধিবেশন যদি এমন অস্থিতিশীল হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের মানুষ চায় একটি কার্যকর সংসদ। গত কয়েক দশকে সংসদ বারবার বয়কট ও ওয়াকআউটের সংস্কৃতির শিকার হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশন যখন শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এবার হয়তো চিত্র বদলাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সংসদীয় সংস্কৃতি বদলানো সহজ নয়।
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা এই অধিবেশনে যদি কেবল নিজেদের রাজনৈতিক রেষারেষি চলে, তবে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যের। জনগণের মৌলিক অধিকার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিয়ে আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিরোধ বড় হয়ে ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা কাজ করছে।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা ও চ্যালেঞ্জ
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের জন্য এই সংসদ পরিচালনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। তিনি নিজেই বলেছেন যে, সংসদ হবে সব কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু যখন বিরোধী দল ওয়াকআউট করে, তখন সেই প্রাণকেন্দ্র কতটা প্রাণবন্ত থাকে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। স্পিকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমেই সংসদকে প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের দূরত্ব
প্রধানমন্ত্রী যেখানে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে বড় করে দেখছেন, সেখানে বিরোধী দলের দাবিগুলোও উপেক্ষা করার মতো নয়। তবে সেই দাবির বহিঃপ্রকাশ যদি কেবল ওয়াকআউট আর হট্টগোলে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে কোনো সমাধান আসবে না। সংসদের প্রথম অধিবেশন এর মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার সংকট প্রকট। এই সংকট দূর না হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হবে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
সংসদের প্রথম অধিবেশন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আগামীর রাজনীতির দিকনির্দেশক। হট্টগোল, প্লাকার্ড প্রদর্শন আর ওয়াকআউট দিয়ে যে যাত্রার শুরু হলো, তা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সংসদকে কার্যকর করার বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার এবং বিরোধী দল—সবাইকে মনে রাখতে হবে যে, সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সংসদকে যদি সত্যিই জনগণের কণ্ঠস্বরে পরিণত করা যায়, তবেই ত্রয়োদশ সংসদ সফল হবে। অন্যথায়, এটিও ইতিহাসের পাতায় আরও একটি তথাকথিত ‘উত্তপ্ত’ সংসদ হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে। আমরা আশা করি, পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত আক্রমণের চেয়ে দেশের উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণী বিতর্কে বেশি মনোযোগী হবেন।
সংসদের প্রথম অধিবেশনের ঘটনা প্রবাহে আপনার প্রতিক্রিয়া বা মতামত কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata