মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপথ: চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র?

চীন-ইরানের বন্ধুত্বে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপথ: চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র? | ব্যাঙেরছাতা

চী-ইরানের বন্ধুত্বে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপথ হয়তো ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হওয়ার পথে চলেছে। ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক আক্রমণ, সেই ফলশ্রুতিতে চলমান পরিস্থিতি পুরো বিশ্বকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এই আর্টিকেলে সেইসব বিষয়েগুলোই বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করবো।

একুশ শতকের বিশ্বরাজনীতিতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। বিশেষ করে এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে চীন ও ইরান। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই আধিপত্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।

অনেকে মনে করছেন, চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা কেবল অর্থনৈতিক নয়। বরং এটি একটি গভীর কৌশলগত মিত্রতা। ওয়াশিংটন এই জোটে ফাটল ধরাতে অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু বেইজিং ও তেহরানের সম্পর্ক দিন দিন মজবুত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় এটি একটি আমূল পরিবর্তন। এই প্রবন্ধে আমরা এই বন্ধুত্বের গভীরতা বিশ্লেষণ করব।

​চীন-ইরানের বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের বিবর্তন

একনজরে আর্টিকেলটির সারাংশ দেখুন: hide

চীন এবং ইরানের সম্পর্কের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। প্রাচীন রেশম পথ বা সিল্ক রোডের সময় থেকেই তাদের যোগাযোগ। তবে আধুনিক যুগে এই সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। সেই সময় থেকেই চীন ইরানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

গত কয়েক দশকে এই সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ কাজ করেনি। বরং এখানে জাতীয় স্বার্থই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশই মনে করে পশ্চিমা একাধিপত্য তাদের বিকাশে বাধা। এই অভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের একে অপরের কাছে টেনে এনেছে। ফলে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এখন বর্তমানের প্রয়োজনে আরও বেশি শক্তিশালী।

​২৫ বছরের মহাপ্রকল্প: বেইজিং-তেহরান অক্ষ

২০২১ সালে চীন ও ইরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই করে। এটি ছিল ২৫ বছর মেয়াদী একটি ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি। এই চুক্তির ফলে চীন-ইরানের বন্ধুত্বে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চীন ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর বিনিময়ে ইরান চীনকে নিয়মিত এবং সস্তায় জ্বালানি তেল দেবে। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কারণ এর মাধ্যমে ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাটানোর পথ পেয়েছে। চীনও মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান নিশ্চিত করার সুযোগ পেয়েছে। এই চুক্তি প্রমাণ করে যে মার্কিন চাপ সত্ত্বেও দেশ দুটি অটল।

​নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি ও চীনের ঢাল

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বছরের পর বছর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি ছিল ভয়াবহ। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু চীন-ইরানের বন্ধুত্বে এই পরিকল্পনা সফল হতে পারেনি। চীন ইরানের কাছ থেকে বড় অংকের তেল কেনা কখনোই বন্ধ করেনি।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত: পরবর্তীতে কে ধরবেন ইরানের মাস্তুল, বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?

আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করছে তারা। এটি মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি। চীনের এই অর্থনৈতিক সমর্থন ইরানকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করেছে। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা নীতি এখন অকার্যকর হওয়ার পথে।

​মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সালিশি এবং চীনের উত্থান

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো বিবাদ মিমাংসা করত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সম্প্রতি চীন সেই চিরাচরিত প্রথা ভেঙে দিয়েছে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনস্থাপনে চীন অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল ও অভাবনীয় চমক। এই ঘটনার পর স্পষ্ট হয়েছে যে চীন-ইরানের বন্ধুত্বে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে যে বিভাজন এবং বৈরিতা টিকিয়ে রেখেছিল, চীন তা দূর করার চেষ্টা করছে। সৌদি-ইরান চুক্তির মধ্যস্থতা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় নৈতিক পরাজয়। বেইজিং এর মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

​সামরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা বলয়

চীন ও ইরানের সম্পর্ক কেবল ব্যবসা বা তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সামরিক এবং প্রতিরক্ষা পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই দেশ মাঝেমধ্যেই ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে যৌথ নৌ-মহড়া দিচ্ছে। অনেক সময় এই মহড়ায় রাশিয়াও তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যোগ দিচ্ছে। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে এই সামরিক দিকটি পেন্টাগনকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। ইরান এখন ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

দেশের নতুন গভর্নর নিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা নাকি অশনিসংকেত?

অন্যদিকে চীন সামরিক প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এই দুই শক্তির সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। তারা নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে বলেও বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে।

​এসসিও এবং ইরানের অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব

ইরান সম্প্রতি শেনহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেছে। এই সংস্থার মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন এবং রাশিয়া। এসসিও-তে ইরানের এই ভুক্তি চীন-ইরানের বন্ধুত্বে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। এর ফলে ইরান এখন আর আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে কোনো রাষ্ট্র নয়। এই জোটের মাধ্যমে এশিয়ার বড় শক্তিগুলোর সাথে ইরানের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে। কিন্তু চীন ইরানের জন্য বিশ্বের একটি বড় অংশের দরজা খুলে দিয়েছে। এখন ইরান এশীয় দেশগুলোর সাথে কোনো বাধা ছাড়াই বাণিজ্য করতে পারছে। এটি আমেরিকার বৈশ্বিক একক প্রভাব কমানোর একটি সুপরিকল্পিত চাল।

​জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির মোড়

চীনের বিশাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। অন্যদিকে ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতকারী দেশ। তাই চীন-ইরানের বন্ধুত্বে জ্বালানি খাত একটি প্রধান খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে চীন ইরান থেকে তেল কিনছে। এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

আবার ইরান তার তেল বিক্রির জন্য একটি বিশাল ও স্থায়ী বাজার পাচ্ছে। ওয়াশিংটন বারবার বেইজিংকে সতর্ক করলেও চীন তা পাত্তা দিচ্ছে না। তেলের এই অবাধ লেনদেন দুই দেশের অর্থনীতিকেই চাঙ্গা রাখছে। এতে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতাও ক্রমে কমছে।

​যুক্তরাষ্ট্র কেন পিছিয়ে পড়ছে?

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র? এর পেছনে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ আছে।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা নীতি অনেক দেশ আর আগের মতো মানছে না।

দ্বিতীয়ত, চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি এখন অপ্রতিরোধ্য।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এখন বিকল্প শক্তির ওপর ভরসা করতে চাইছে। তারা কেবল ওয়াশিংটনের হুকুম মেনে চলতে নারাজ। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ঘনঘন নীতি পরিবর্তন মিত্রদের মনে সংশয় তৈরি করছে। বিপরীতে চীনের বিনিয়োগ ও উন্নয়নমূলক নীতি অনেক দেশকে আকর্ষণ করছে। এই সবকিছুর মিলিত প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য হারাচ্ছে।

​ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু ও চীনের কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল হলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও প্রধান মিত্র। অন্যদিকে ইরানকে ইসরায়েল তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। তাই চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র সমানভাবে আতঙ্কিত। চীন এই অঞ্চলে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে রাজনীতি করছে। তারা ইরানের সাথে সখ্যতা রাখছে, আবার আরব বিশ্বের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কঠিন এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইরানকে একটি ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু চীন ইরানকে একটি ‘দায়িত্বশীল অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরছে। এই বৈপরীত্যই ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক লড়াইয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে।

​ডিজিটাল সিল্ক রোড ও সাইবার সিকিউরিটি

ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হবে উন্নত প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। চীন ও ইরান এখন সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে একে অপরকে সাহায্য করছে। চীনের ৫জি প্রযুক্তি এবং উন্নত নজরদারি সরঞ্জাম ইরানে ব্যবহৃত হচ্ছে। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে এই ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন একটি বড় স্তম্ভ।

যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হবে। এটি পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান চীনের সহায়তায় তাদের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করছে। ফলে বাইরে থেকে কোনো সাইবার হামলা বা হস্তক্ষেপ ঠেকানো তাদের জন্য সহজ হচ্ছে।

​ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মেরুকরণ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতি স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলো, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ইরান জোট। এই যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবার চীনও রাশিয়ার সাথে ‘সীমাহীন বন্ধুত্বের’ ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন-ইরানের বন্ধুত্বে একটি নতুন শক্তির অক্ষ বা এক্সিস তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই জোটকে ভাঙতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, চাপ যত বাড়ছে, দেশগুলো তত বেশি একে অপরের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এই নতুন মেরুকরণ আমেরিকার ‘ইউনিপোলার’ বা একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার অবসান ঘটাচ্ছে।

​বিআরআই প্রকল্প এবং ইরানের ভৌগোলিক গুরুত্ব

চীনের স্বপ্নের প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরান। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে ইরানের অবস্থান কৌশলগতভাবে অনন্য। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে এই ভৌগোলিক সুবিধা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এর মাধ্যমে চীনের পণ্য স্থলপথে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে খুব সহজে পৌঁছাতে পারবে।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো: স্থায়িত্ব নাকি সাংবিধানিক সংকটের পথে যাত্রা?

আবার মধ্য এশিয়ার সাথে ইরানের অর্থনৈতিক সংযোগ আরও গভীর হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই বিআরআই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু ইরানের মতো দেশগুলোর জন্য এই প্রকল্প উন্নয়নের বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে। এই করিডোর সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব হবে চিরস্থায়ী। তখন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে পারবে না।

​বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও জনমতের প্রতিফলন

বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকাগুলোতেও এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। “চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র?”—এই ধরণের শিরোনামের নিবন্ধগুলো পাঠকদের নজর কাড়ছে। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত কোনো পরাশক্তির একক আধিপত্যের চেয়ে বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা পছন্দ করে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের বড় ধরণের বিনিয়োগ রয়েছে।

আবার ইরানের সাথেও আমাদের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই চীন-ইরানের বন্ধুত্বে যে নতুন মেরুকরণ ঘটছে, তাকে বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো নিরপেক্ষভাবে এই ক্ষমতার পালাবদল তুলে ধরছে।

​ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তবে চীন-ইরানের বন্ধুত্বে সব যে মসৃণ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। চীনের ওপরও মার্কিন চাপের প্রভাব রয়েছে। আবার ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নানা সংকট রয়েছে। কিন্তু দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের একক খবরদারি বন্ধ করা। এই লক্ষ্যে তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি তার পুরনো নীতিতে অটল থাকে, তবে পরাজয় এড়ানো কঠিন হবে। বেইজিংয়ের ‘উইন-উইন’ ডিপ্লোম্যাসি বনাম ওয়াশিংটনের ‘স্যাংশন’ ডিপ্লোম্যাসির লড়াই এখন তুঙ্গে। এই লড়াইয়ের ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এখন নতুন সূর্য উদিত হচ্ছে। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে ব্যর্থ হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র—এই কথাটি এখন কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং রূঢ় বাস্তবতা। কেবল সামরিক ভয় দেখিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো সার্বভৌম জাতিকে চিরকাল দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

বেইজিং ও তেহরানের এই মিত্রতা কোনো সাময়িক সমঝোতা নয়। এটি একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রকে যদি তার বিশ্ব নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই দমনমূলক নীতি পরিহার করতে হবে। বিশ্ব এখন আর একক কোনো দেশের ইশারায় চলে না। চীন-ইরানের বন্ধুত্বে যে নতুন শক্তির বলয় তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।

ক্ষমতার এই নয়া ভারসাম্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য যেমন সুযোগ এনেছে, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এনেছে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই হয়তো আগামী দিনের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

দীর্ঘ এই আর্টিকেলটি পড়ার পর আপনার প্রতিক্রিয়া বা মতামত কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *