
বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক-এর ইস্যুটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণগুলো আমূল বদলে গেছে। গত দেড় দশকে ভারত যেভাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর বিনিয়োগ করেছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই নীতি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বর্তমানের এই নাজুক ও ভঙ্গুর কূটনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে এবং এই অচলাবস্থা নিরসনে কার ভূমিকা হওয়া উচিত অগ্রগণ্য।
পটভূমি: একপাক্ষিক নীতির অবসান
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (Neighbors First), কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি অনেকটা ‘আওয়ামী লীগ প্রথম’ নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে, তখন ভারত এক ধরনের কৌশলগত অস্বস্তিতে পড়েছে। বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক এক সময় যে ‘সোনালী অধ্যায়’ হিসেবে দাবি করা হতো, তা এখন অনেকটাই ম্লান। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ভারতের নীতি নির্ধারকরা সম্ভবত ভাবেননি যে এত দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যাবে। ফলে বর্তমান অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে হলে পুরনো চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিবিসি বাংলার মূল বক্তব্য: উদ্যোগ কার হওয়া উচিত?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতকেই আলোচনার টেবিলে প্রথম বসার আহ্বান জানাতে হবে। কূটনীতিতে সব সময় ছোট প্রতিবেশীর চেয়ে বড় প্রতিবেশীর দায়িত্ব বেশি থাকে। ভারত যদি মনে করে তারা কেবল পর্যবেক্ষণ করবে এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো বিশেষ প্রস্তাবের অপেক্ষা করবে, তবে সেটি হবে বড় কৌশলগত ভুল। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান জনমতের একটি বড় অংশ ভারতের বিগত বছরের ভূমিকার ওপর ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে হলে ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন জরুরি।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
গণভোটে মেটিকুলাস ডিজাইন: ভোট কাস্টিংয়ের হার ২৪৪% কীভাবে কোথায় থেকে অবতীর্ণ হলো?
অবিশ্বাসের দেয়াল: কেন এই দূরত্ব?
বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক শীতল হওয়ার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে:
১. আশ্রয় ইস্যু:
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের বিষয়টিকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বর্তমান প্রশাসন ভালোভাবে নেয়নি।
২. সীমান্ত হত্যা:
সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি, যা জনমনে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে।
৩. পানি বণ্টন:
তিস্তা চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলে থাকা বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে একটি বড় কাঁটা।
৪. সংখ্যালঘু ইস্যু ও প্রোপাগান্ডা:
বাংলাদেশের পরিবর্তনকে ভারতের কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যমে যেভাবে ‘সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা’ হিসেবে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতের ওপর বিরক্ত।
বিএনপি ও ভারতের নতুন সমীকরণ
বিএনপি নেতৃত্বাধীন বা প্রভাবিত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত কি পারবে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে? এটি এখন বড় প্রশ্ন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার বলেছেন যে, তারা ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চান, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত এখন বিএনপির সাথে যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে। অতীতে বিএনপিকে নিয়ে ভারতের যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা কাটিয়ে ওঠার সময় এসেছে। বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক যদি কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের হয়, তবেই তা টেকসই হবে।
অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের সংযোগস্থল
ভারতকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। আবার বাংলাদেশের জন্যও ভারত একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু এই অর্থনৈতিক লেনদেন তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন রাজনৈতিক বিশ্বাস অটুট থাকে। বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক যদি কেবল ট্রানজিট আর কানেক্টিভিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মানুষের মনের সংযোগ (People-to-people connection) বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
নতুন সংসদের অভিযাত্রা: কেন অনিবার্য হয়ে পড়েছেন বিদায়ী ‘স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার’?
বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের করণীয়
বিবিসির বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভারতকে তার ‘বিগ ব্রাদার’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে ‘বিগ পার্টনার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে সম্মান জানানোই হবে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ। ভারতকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী মানেই ভারত বিরোধী নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সাথে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি দিল্লিকে রাখতে হবে।
ভারতের উচিত হবে:
০১। বাংলাদেশের নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের সাথে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপ শুরু করা।
০২। ভিসা জটিলতা দূর করে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করা।
০৩। বাংলাদেশে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক সমর্থন দেওয়া।
০৪। সীমান্তে বিএসএফ-এর মারমুখী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা।
এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা
সম্পর্ক কখনও একতরফা হয় না। ভারতকে উদ্যোগ নিতে হবে সত্য, তবে বাংলাদেশকেও প্রতিবেশী হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, বাংলাদেশের মাটি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হবে না। একই সাথে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো সস্তা আবেগ বা উগ্র জাতীয়তাবাদ যেন কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও বহুপাক্ষিক প্রভাব
বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই এককভাবে চলতে পারে না। বাংলাদেশের ওপর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে। ভারত যদি বাংলাদেশের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে, তবে সেই শূন্যস্থান অন্য কোনো শক্তি দখল করবে, যা ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনটি এই দিকটিকেই ইঙ্গিত করেছে যে, বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক যদি ভারত সংশোধন না করে, তবে তারা কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব বজায় রাখতে হলে ঢাকাকে পাশে রাখা দিল্লির জন্য কোনো বিকল্প নয়, বরং অনিবার্য।
সংকটের সমাধান কোন পথে?
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের তিক্ততা ভুলে এবং গত এক দশকের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দুই দেশের এগিয়ে যাওয়া উচিত। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের পক্ষ থেকেই সেই হাতটি প্রথম বাড়ানো উচিত কারণ তারা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা দিয়ে যদি নতুন করে সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করা হয়, তবেই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি বজায় থাকবে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
গণভোটের হ্যাঁ বনাম বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়: বাংলাদেশের আগামীর ক্ষমতার সমীকরণ ও জুলাই সনদের ভাগ্য
বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক কেবল মানচিত্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং অর্থনীতির গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। এই বন্ধনকে ছিঁড়ে না ফেলে বরং আরও দৃঢ় করতে হলে উভয় পক্ষকে পরিপক্কতার পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের উচিত হবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদেশনীতি প্রণয়ন করা। আমরা আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক নিবন্ধসমূহ
এই বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধটি তৈরিতে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
বিবিসি বাংলা: বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত (মূল বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন)।
প্রথম আলো: বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে কি নতুন করে সম্পর্ক গড়তে পারবে ভারত?
বাংলাদেশ প্রতিদিন: বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ ভারতকেই নিতে হবে: বিবিসির প্রতিবেদন
মানবজমিন: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠন ও ভারতের দায়িত্ব শীর্ষক বিশ্লেষণ
অন্যান্য উৎস: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং সমসাময়িক কূটনৈতিক সংবাদ পর্যালোচনা।