নতুন সংসদের অভিযাত্রা: কেন অনিবার্য হয়ে পড়েছেন বিদায়ী ‘স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার’?

স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার
নতুন সংসদের অভিযাত্রা: কেন অনিবার্য হয়ে পড়েছেন বিদায়ী ‘স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার’? | ব্যাঙেরছাতা

স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণ আমরা পার করছি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ চললেও, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর এখন প্রধান আলোচনা হলো নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ। তবে এই প্রক্রিয়ায় একটি বিশাল সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। নিয়মানুযায়ী নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো এবং প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর উপস্থিতি অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কোথায় আছেন বা তাদের আইনি অবস্থান কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কৌতুহল ও বিতর্কের শেষ নেই। আজকের এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন নতুন সংসদের যাত্রা শুরু করতে হলে বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে ফিরিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প কোনো সহজ পথ নেই।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও শপথের জটিলতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হয়। ঐতিহাসিকভাবে এই শপথ পাঠ করান বিদায়ী সংসদের স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনি বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর কথা ভাবলেও, সংবিধানে এর প্রয়োগ সীমিত। যদি গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার শপথ না পড়ান, তবেই কেবল পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু মূল সমস্যাটি শপথ নিয়ে নয়, বরং সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু করা নিয়ে।

প্রথম অধিবেশন ও সভাপতিত্বের সংকট

সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কার্যপ্রণালী বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে যে, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে বিদায়ী সংসদের স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর সভাপতিত্বে। তাদের অনুপস্থিতিতে নতুন সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা আইনগতভাবে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। কারণ, নতুন স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আগের স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-ই পদে বহাল থাকেন। সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া সত্ত্বেও নতুন স্পিকার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার তাদের পদে আসীন থাকেন।

এই আর্টিকেলে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

গণভোটের হ্যাঁ বনাম বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়: বাংলাদেশের আগামীর ক্ষমতার সমীকরণ ও জুলাই সনদের ভাগ্য

আইন উপদেষ্টার ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা বাংলাদেশের একমাত্র মহাজ্ঞানী আসিফ নজরুল সম্প্রতি মত দিয়েছেন যে, যেহেতু বিদায়ী স্পিকার পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে আছেন, তাই তাদের মাধ্যমে শপথ করানোর সুযোগ নেই। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একটি ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে। সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার পদত্যাগ করলেও তিনি নতুন সংসদের প্রথম বৈঠক পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন। অর্থাৎ, আইনি দৃষ্টিতে স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার এখনো তাদের পদে বহাল আছেন। সরকার যদি তাদের পাশ কাটিয়ে বিকল্প কোনো পথে সংসদ শুরু করতে চায়, তবে তা ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ফলে নতুন সংসদের বৈধতা রক্ষার্থেই অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হলেও বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে সংসদে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

কারাগার ও আত্মগোপন: আইনি সমাধানের পথ

বর্তমানে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে আছেন এবং বিদায়ী স্পিকারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি চায় তবে ডেপুটি স্পিকারকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে সংসদে এনে অধিবেশন পরিচালনা করানো সম্ভব। অন্যদিকে, বিদায়ী স্পিকার যদি জামিন পান, তবে তার দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা থাকে না। নতুন সংসদকে আইনি গর্ত থেকে বাঁচাতে হলে বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর যেকোনো একজনকে অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করতেই হবে। অন্যথায় ‘স্পিকার প্রোটেম’ বা অস্থায়ী স্পিকারের যে ধারণা অন্য দেশে আছে, সেটি আমাদের সংবিধানে না থাকায় এক বিশাল আইনি শূন্যতা তৈরি হবে।

দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি ‘লিগ্যাল কন্টিনিউটি’ বা আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও নজর রাখছে যে, বাংলাদেশ কীভাবে এই সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা করে। যদি বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে পুরোপুরি বাদ দিয়ে সংসদ শুরু করা হয়, তবে তাকে একটি ‘অসাংবিধানিক সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করার ঝুঁকি থেকে যায়। অতীতেও বাংলাদেশে এমন জটিলতা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর মাধ্যমেই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

এই আর্টিকেলে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

ডিজিটাল কারফিউ? ভোটের লড়াইয়ে পকেটবন্দী সাধারণ মানুষ ও আগামীর অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশে কি ডিজিটাল কারফিউ চলছে?

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও রাজনৈতিক প্রভাব

যদি বর্তমান সরকার জেদ করে বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে এড়িয়ে চলে, তবে ভবিষ্যতে যখনই কোনো নিয়মিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে, তখন এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সমস্ত সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আসিফ নজরুলের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো ভবিষ্যতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। নতুন সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য পুরনো স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-এর স্বাক্ষর ও সায় অপরিহার্য। এই আইনি চেইন ভেঙে ফেললে পুরো সংসদীয় ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই আর্টিকেলে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে কড়া বার্তা: বাংলাদেশে গণতন্ত্রের গভীর সমস্যা ও উত্তরণের চ্যালেঞ্জ

পরিশেষে বলা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানই হলো সর্বোচ্চ আইন। আবেগ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সাংবিধানিক পদাধিকারীদের এড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়। নতুন সংসদের যাত্রা মসৃণ করতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। তারা অপরাধী কি না তা আদালতের বিষয়, কিন্তু তাদের সাংবিধানিক পদটি যতক্ষণ বিলুপ্ত হচ্ছে না, ততক্ষণ তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়াটাই হবে আইনের শাসন। আমরা আশা করি, সরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে এবং বিদায়ী স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার-কে ব্যবহার করেই নতুন সংসদীয় যুগের সূচনা করবে। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জয় হোক এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষিত হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক উৎসসমূহ
ভিডিও বিশ্লেষণ: কাজী রুনা (Kazi Runa) পরিচালিত নিউজ অ্যানালাইসিস প্রতিবেদন: “স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে যে কারণে ফেরাতেই হবে : শপথ পড়ানো গেলেও শুরু হবে না সংসদ অধিবেশন” (প্রকাশকাল: ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।

সাংবিধানিক রেফারেন্স: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭২(১): সংসদের অধিবেশন আহ্বান ও সময়সীমা সংক্রান্ত।

অনুচ্ছেদ ৭৪(৩) ও ৭৪(৬): স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদের মেয়াদ ও কার্যভার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিশেষ বিধান।

অনুচ্ছেদ ১৪৮: নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ও পরিচালনার আইনি প্রক্রিয়া।

আইনি নথি: জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান অধ্যাদেশ ২০২৪ এবং সংশ্লিষ্ট গেজেটসমূহ।

সংবাদ মাধ্যম: বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক (প্রথম আলো, ডেইলি স্টার) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোতে প্রকাশিত ২০২৪-২০২৬ সালের সংসদীয় সংকট সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন ও আইন উপদেষ্টার প্রেস ব্রিফিং।

বিশেষজ্ঞ মতামত: সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত আইনি ব্যাখ্যা ও টকশো আলোচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *