সম্পর্কের গন্তব্য
রোমান্টিক প্রেমের গল্প
দ্বিতীয় পর্ব
নওরোজ বিপুল
দশটা থেকে অফিস। সকাল নয়টায় মেস থেকে বের হলো রোমেল। অফিস থেকে মেস কিছুটা দুরেই। মেস থেকে অফিসে পৌঁছাতে আধা ঘন্টার কিছু বেশি সময় লাগে। বাকি সময় হাতে নিয়ে বের হয় সে। জ্যামে আটকা পড়ে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার ঝামেলা থাকে না।
মেস থেকে বের হয়ে সামনের মোড় পর্যন্ত হেঁটেই আসলো রোমেল। হাঁটছে আর ভাবছে, ভাবনার কারণ ওর মেস। আগামী মাস থেকে মেস ছেড়ে দিতে হবে। বাড়িওয়ালা তার বাড়ি থেকে মেস তুলে দিচ্ছে। বিল্ডিংটা অনেক পুরনো। সেটা ভেঙ্গে সেখানে নতুন এ্যাপার্টমেন্ট তোলা হবে। এ্যাপার্টমেন্টে নতুন করে আর মেস খোলা হবে না। সেটাই স্বাভাবিক। ঢাকায় কোনো এ্যাপার্টমেন্টের নিচতলায় কোনো মেস আছে বলে রোমেলের অন্তত জানা নেই। সুতরাং বাড়িওয়ালা মেসের সবাইকে নোটিশ দিয়েছে। এক মাসের মধ্যে সবাইকে মেস ছাড়তে হবে। এটাই রোমেলের চিন্তার বিষয়। এই মেসের আশেপাশে আর কোনো মেস নাই। থাকলে কোনো সমস্যা হতো না। মেস বিল্ডিংয়ের আশে-পাশে, সামনে পিছনের সবগুলোই এ্যাপার্টমেন্ট। ওদের মেস বিল্ডিংটাই শুধুমাত্র পুরনো বিল্ডিং। পুরনো বিল্ডিং বাড়িওয়ালার চোখে বেমানান লাগছে। বেমানানটা কাটাতেই বাড়িওয়ালা পুরনো বিল্ডিং ভেঙ্গে নতুন এ্যাপার্টমেন্ট তুলছে।
তাতে রামেলের কোনো সমস্যা নাই। বাড়িওয়ালা তার জায়গায় এ্যাপার্টমেন্ট তুলুক আর শশ্মান বানিয়ে রাখুক তাতে রোমেলের কিছু যায় আসে না। ওর যেটা সমস্যা সেটা হলো থাকার জায়গা। অফিসের আশে-পাশে কোনো মেস নেই। থাকলে সেখানে গিয়ে রোমেল উঠতে পারত। একটা বাসা যে ভাড়া নেবে সেটাও হচ্ছে না। একটায় সমস্যা সে অবিবাহিত যুবক। অবিবাহিত যুবককে কোনো বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে না।
রোমেল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দেশের প্রতিষ্ঠিত একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকুরীও করে। প্রচুর টাকা বেতন পায়। সুতরাং নিজে একটা বাড়ি ভাড়া করে নিয়ে থাকতে ওর কোনো সমস্যায় হবে না। চাকুরী পাওয়ার পরে বাড়ি ভাড়া করার চিন্তাও করেছিল সে। চিন্তা তার পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। অবিবাহিত ছেলে হওয়ায় তখনো সে বাড়ি ভাড়া নিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মেসে গিয়ে উঠেছিল। এখন আবার সেই একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর থেকে বাড়ি ভাড়া নেয়ার জন্য কয়েক জায়গায় গিয়েছিল সে। সব বাড়িওয়ালার একই কথা, তারা বউ ছাড়া কোনো ছেলেকে বাড়ি ভাড়া দেবে না। এ তো এক বিড়াট সমস্যা। এখন সে বউ কোথায় পায়? রাতারাতি বিয়ে করা কি মুখের কথা নাকি?
অবশ্য রোমেলের মা রোমেজা বেগম গত এক বছর যাবৎ ছেলেকে বিয়ে করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। রোমেল এখন বিয়ে করবে না বলে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে তার মাকে। তারপরেও তিনি যখনি ছেলের সাথে কথা বলেন, কথা শেষ হওয়ার আগে তিনি প্রতিবারই বলেন, বাবা এবার একটা বিয়ে কর। রোমেল তার মায়ের কথাতে শুধু হাসে আর বলে, আর কিছু দিন যাক, আর কিছু দিন যাক। এখন এসে খুব পস্তাচ্ছে রোমেল। মায়ের কথা মেনে নেয়া উচিৎ ছিল। বিয়ে করলে এখন এই সমস্যায় ওকে পড়তে হতো না। সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য এখন কি একটা বিয়ে করে আনবে? সেটা কীভাবে সম্ভব? বিয়ে তো অনেক আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার। মেয়ে খুঁজে বের করতে হবে। শুধু মেয়ে খুঁজে বের করলেই হবে না। সেই মেয়েকে রোমেলের যোগ্য হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রোমেলের মায়ের পছন্দ হতে হবে। তারপরে আরো অনেক আনুষ্ঠাকিতা। তারপরে বিয়ে। রোমেলের প্রেমিকা নাই। থাকলে তাকে নিয়ে মায়ের সামনে গিয়ে দাড়াতে পারতো। বলতে পারতো, এই যে মেয়ে নিয়ে এসেছি। বিয়ে দিয়ে দাও।
ভাবতে ভাবতে প্রধান রাস্তায় উঠে আসলো রোমেল। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো প্রতিদিনই সে লোকাল বাসে করে অফিসে যায়।
মোড়ে এসে দাড়ানোর কয়েক মিনিট পরেই একটা বাস আসলো। বাসের ভেতর প্রচন্ড ভিড়। ঠেলেঠুলে ভিড়ের ভেতরেই উঠে পড়লো রোমেল। বসার জন্য সীট পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। দাড়িয়েই থাকতে হলো ওকে। বাস কিছুদুর যাচ্ছে। আবার দাড়াচ্ছে। আবার কিছুদুর যাচ্ছে। লোক তোলার জন্য আবার দাড়াচ্ছে। প্রচন্ড বিরক্তবোধ করলো রোমেল। বিরক্তবোধ করেও কোনো লাভ নেই। লোকাল বাস। ওরা এভাবেই চলবে। এভাবে চলতে চলতে অবশেষে গন্তব্যে এসে পৌঁছালো রোমেল। বাস থেকে নেমে দেখলো পৌনে দশটা বাজে। পনের মিনিট সময় আরো হাতে আছে।
অফিস থেকে কিছুটা দুরে, রাস্তার ফুটপাতে একটা চায়ের দোকান। প্রতিদিন বাস থেকে নেমে, অফিসে ঢোকার আগে, এখানে এককাপ চা খায় রোমেল। ব্যাপারটা নিয়মিত হয়ে যাওয়াতে চা বিক্রেতার সাথে একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে। দোকানের সামনে দাড়াতেই চা বিক্রেতা বলল, ‘দুই মিনিট সার, চা দিতাছি। আর কিছু খাইবেন, সার?’
‘না, আর কিছু খাবো না।’ বলল রোমেল, ‘শুধু চা-ই দাও।’
দুই মিনিট সময় লাগলো না। তার আগেই চা দিলো চা বিক্রেতা। চা খেয়ে অফিসের দিকে হাটতে লাগলো রোমেল। ইতিমধ্যে অফিসে অনেকেই পৌঁছে গেছে। রোমেলকে দেখে অফিস পিয়ন সালাম দিলো। রোমেলের সাথে সাথে ওর রুমে আসলো। চেয়ার টেবিল সব মুছে দিলো। নিজের চেয়ারে বসলো রোমেল। পিয়নকে বলল, ‘ইউনূস, তোমার জিনিয়া ম্যাডাম এসেছে?’
রোমেলের ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারগুলো মুছছিল পিয়ন ইউনূস। মুছতে মুছতে সে বলল, ‘অহনো আহে নাই, স্যার।’
‘যখন আসবে তখন জিনিয়া ম্যাডামকে আমার সালাম দিও, ঠিক আছে?’
‘আইচ্ছা সার, দিমু অনে।’
চেয়ার মোছা হয়ে গেলে ইউনূস বের হয়ে গেলো ডেস্কটপ কম্পিউটার অন করলো রোমেল। কাজে মনযোগ দিলো। বিদেশী এক ক্লায়েন্টের একটা ওয়েবসাইটা তৈরি কাজে হাত দিয়েছিল সে। সাতদিনের মধ্যে কাজটা ডেলিভারি দিতে হবে। তিন দিনেই কাজ আশি ভাগ শেষে করে এনেছে সে। বাকি বিশ ভাগ কাজ শেষ করতে আর একদিনের মত লাগবে। রোমেল আশা করছে তারপরের দিনই কাজটা ক্লায়েন্টের কাছে ডেলিভারি দিতে পারবে। এটা রোমেলের অফিসিয়াল কাজ নয়। ব্যক্তিগত এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে কাজটা সে নিয়েছিল।
প্রায় এক ঘন্টা পর রোমেলের রুমের দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। কেউ এসেছে। দরজার দিকে না তাকিয়েই রোমেল বলল, ‘কাম ইন।’
দরজা ঠেলে ঢুকলো জিনিয়া। রোমেলের ডেস্কের দিকে আসতে আসতে বলল, ‘কি রে, আমাকে নাকি সালাম দিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, দিয়েছিলাম তো।’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’ সামনের একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো জিনিয়া।
‘শয়তানী করছিস!’
‘শয়তানী আবার কোথায় করলাম?’ যেন খুবই আশ্চর্য্য হয়েছে তেমন একটা ভাব নিলো জিনিয়া, ‘সালামের জবাব দেয়া আবার শয়তানী করা হলো কবে থেকে?’
কম্পিউটার মনিটর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জিনিয়ার দিকে তাকালো রোমেল। বলল, ‘শয়তানী করার উদ্দেশ্যেই আমার সামনে এসে সালামের উত্তর দিয়েছিস। অফিসিয়াল সালামের মানে যে কাউকে ডেকে পাঠানো, সেটা তো ভাল করেই জানিস!’
‘হুম জানি, কিন্তু কি জন্য ডেকেছিস সেটা বল।’
‘একটা সমস্যায় পড়েছি।’
‘কী রকম সমস্যা?’
‘আমার মেস থেকে নোটিশ দিয়েছে।’
‘কীসের নোটিশ?’
‘মেস ছাড়তে হবে।’
‘কেন ছাড়তে হবে?’
‘বিল্ডিং ভেঙ্গে এ্যাপার্টমেন্ট তুলবে বাড়িওয়ালা।’
‘ও এই ব্যাপার, তো অন্য মেসে উঠে পড়!’
‘ওখানে আশে-পাশে কোনো মেস নাই। যেখানে আছে সেখান থেকে অফিস খুব দুরে হয়ে যায়।’
‘তাহলে এই সব মেস ফেস বাদ দে তো! একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নে।’
‘নিতেই তো গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বাড়িওয়ালা শালাই বউ ছাড়া তাদের ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না।’
কথাটা শুনে খুব হাসলো জিনিয়া। হাসি যখন থামলো, বলল, ‘আহারে কপাল! আমি বিয়ে না করলে তো, তোর বউ সেজে গিয়ে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে, তোর সাথেই থেকে যেতাম!’ বলে আবার হাসতে লাগলো জিনিয়া।
‘এতো হাসিস না তো, আমার বিরক্ত লাগছে।’ বলল রোমেল, ‘তোর কাছে কোনো বুদ্ধি আছে নাকি বল।’
‘বিয়ে করে ফেল!’
‘এটা কোনো বুদ্ধি দিলি নাকি কুবুদ্ধি দিলি?’ বলল রোমেল, ‘বিয়ে তো আর ছেলের হাতের মোয়া না যে, চাইলাম আর পেয়ে গেলাম।’
এতক্ষণ পর এসে জিনিয়াকে কিছুটা সিরিয়াস মনে হলো। বলল, ‘আচ্ছা দেখি, আজ বাসায় গিয়ে আবিরের সাথে আলাপ করে দেখব। এলাকায় ওর ভালো একটা প্রভাব আছে। হয়তো কোনো বাসায় তোকে সাব-লেট হিসেবে তুলে দিতে পারবে।’
জিনিয়ার স্বামী আবির। সেও একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরী করে। কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা সে। সাথে সাথে সে স্থানীয় ছেলে হওয়ায়, এলাকার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথেও একটু আধটু জড়িত। কোনো দলীয় রাজনীতি নয়। এলাকায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে আবির এগিয়ে যায়। সমস্যা সমাধানের চেষ্ট করে। দেশে যে কোনো ধরণের নির্বাচন আসলে এলাকার ছোট খাটো নেতারা আবিরের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে। এই পর্যন্তই আবিরের রাজনৈতিক কর্মকান্ড। এর চেয়ে বেশি সে কোনো কাজেই যায় না। অবশ্য বউ ছাড়া কোন ছেলেকে কোনো বাসায় তুলে দিতে পারবে কি না, সেই ব্যাপারে জিনিয়ারও একটু আধটু সন্দেহ আছে।
রোমেলকে তবু একটু সান্তনা, একটু আশ্বাস দিয়ে উঠে পড়লো জিনিয়া। রোমেলের রুম থেকে বের হয়ে এসে নিজের রুমে ঢুকলো সে। আপাতত কাজে মনযোগ দিলো। জিনিয়া আর রোমেল খুব ভালো বন্ধু। ইউনিভার্সিটিতে এক সাথে পড়ালেখা করেছে তারা। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর উচ্চতর পড়ালেখা করার জন্য ঢাকায় এসেছিল রোমেল। কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল সে। একই বিষয় নিয়ে, একই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল জিনিয়াও। তখন থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। পড়ালেখা শেষ করে একই অফিসে চাকুরীতেও ঢুকেছে ওরা। এই অফিসে আগে জিনিয়ারই চাকুরী হয়েছিল। কিছুদিন পরে জিনিয়া অনেক চেষ্টা তদবির করে রোমেলকেও চাকুরীতে ঢুকিয়েছে। চাকুরীতে ঢোকার পর বিয়ে হয়েছে জিনিয়ার। এখনো বাচ্চা কাচ্চা কিছু হয়নি।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আবারো রোমেলের সাথে দেখা করলো জিনিয়া। ওকে চিন্তা করতে নিষেধ করলো। ওকে বাড়ি ভাড়া করার চেষ্টা করে যেতে বলল। জিনিয়া নিজেও চেষ্টা করবে বলে জানালো রোমেলকে।
পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।
পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন: