
পৃথিবী বিখ্যাত রথি-মহারথিগণ এ্যাপস্টেইনের বেড়াজালে। বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত ও জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে সময়টাতে একদিকে আমরা প্রযুক্তির চরম শিখরে আরোহণ করছি, অন্যদিকে আমাদের আদর্শিক ও নৈতিক স্তম্ভগুলো একের পর এক ভেঙে পড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ব মিডিয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অলিগলির চায়ের আড্ডা—সবখানেই একটি নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: জেফ্রি এপস্টেইন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সময়ের প্রভাবশালী এই ধনকুবেরের মৃত্যুর প্রায় সাত বছর পর নতুন করে প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বা আদালতের গোপন নথিপত্র পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। কেন একজন মৃত ব্যক্তির নথিপত্র নিয়ে আজ পুরো বিশ্ব এতটা সরগরম? কেনই বা বাংলাদেশের মতো দূরবর্তী দেশেও এটি আলোচনার শীর্ষে? এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করব এপস্টেইনের সেই অন্ধকার জগতের রহস্য এবং দেখব কীভাবে বিশ্বের রথি-মহারথিগণ তাঁর বিছানো জালের শিকার হয়েছিলেন।
পৃথিবী বিখ্যাত রথি-মহারথিগণ এ্যাপস্টেইনের বেড়াজালে: কে এই জেফ্রি এপস্টেইন?
জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টেইন (১৯৫৩-২০১৯) ছিলেন একজন মার্কিন ফিনান্সিয়ার বা বিনিয়োগকারী। সাধারণ এক স্কুল শিক্ষক থেকে তিনি কীভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন, তা আজও এক রহস্য। তবে অর্থের চেয়েও বড় ছিল তাঁর নেটওয়ার্ক। ম্যানহাটনের বিশাল অট্টালিকা, ফ্লোরিডার পাম বিচের ম্যানশন এবং ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত নিজস্ব দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’—এই ছিল তাঁর রাজত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
এপস্টেইন কেবল একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন উচ্চবিত্ত সমাজের ‘কানেক্টর’। রাজনীতি, বিজ্ঞান, ব্যবসা এবং বিনোদন জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সখ্য। কিন্তু এই চাকচিক্যময় জীবনের আড়ালে ছিল এক বিভীষিকাময় জগত। ২০০৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম নাবালিকা পাচার ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। তবে তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের সাথে তাঁর সম্পর্কের কারণে তিনি অত্যন্ত লঘু শাস্তির মাধ্যমে রেহাই পেয়ে যান। কিন্তু ২০১৯ সালে আবারও ফেডারেল অভিযোগের মুখে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকদের ভাষায় এটি আত্মহত্যা হলেও জনমনে এখনো প্রশ্ন রয়েছে—তাঁকে কি তবে সত্য গোপন রাখতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
এপস্টেইনের বেড়াজাল: রথি-মহারথিদের পদচারণা
এপস্টেইনের কুখ্যাত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’ কে ভুক্তভোগীরা ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ বা ‘পাপের দ্বীপ’ বলে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি মার্কিন আদালত কর্তৃক অবমুক্ত হওয়া প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথিপত্র এবং ফ্লাইট লগ (বিমানের যাত্রী তালিকা) থেকে জানা গেছে, কারা কারা এই দ্বীপে বা এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াত করতেন। তালিকায় যাদের নাম এসেছে তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একেকজন মহীরূহ।
১. বিল ক্লিন্টন:
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের নাম এই ফাইলগুলোতে বহুবার এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একাধিকবার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেছেন। যদিও ক্লিন্টন সব সময় দাবি করেছেন যে তিনি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন না, তবুও নথিপত্রে তাঁর নাম বারবার আসা তাঁর রাজনৈতিক ইমেজকে সংকটে ফেলেছে।
২. প্রিন্স অ্যান্ড্রু:
ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই সদস্য এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় মুখ। ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামক এক নারী অভিযোগ করেছেন যে ১৭ বছর বয়সে তাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই বিতর্কের কারণে তাকে তাঁর রাজকীয় উপাধি ও পদবী ত্যাগ করতে হয়েছে।
৩. বিল গেটস:
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের নামও এই তালিকায় পাওয়া গেছে। ম্যালিন্ডা গেটসের সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে এপস্টেইনের সাথে তাঁর সম্পর্কের একটি বড় ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে।
৪. ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক:
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি এপস্টেইনকে অনেক আগেই ত্যাগ করেছেন, কিন্তু পুরোনো ভিডিও ও ছবিতে তাদের ঘনিষ্ঠতা প্রমাণিত। অন্যদিকে সাম্প্রতিক নথিতে ইলন মাস্কের নামও ইমেইল চালাচালিতে উঠে এসেছে, যা নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চলছে।
এই তালিকায় আরও আছেন সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক, পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং অসংখ্য হলিউড তারকা। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই জ্ঞানতাপস এবং প্রভাবশালীরা একজন যৌন অপরাধীর দ্বীপে যেতেন? উত্তরটি সম্ভবত লুকিয়ে আছে এপস্টেইনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ কৌশলের মাঝে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: ড. ইউনূসের নাম ও বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অন্য মাত্রা পেয়েছে কারণ প্রকাশিত নথিপত্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম এসেছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই তথ্যটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ২০১০ সালের একটি ইমেইল এবং এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিজলাইন ম্যাক্সওয়েলের বোন ইজাবেল ম্যাক্সওয়েলের সাথে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের পেশাদার ও ব্যক্তিগত সখ্য। নথিপত্র অনুযায়ী, ইজাবেল ম্যাক্সওয়েল ড. ইউনূসের ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এছাড়া এপস্টেইনের সহযোগী আল সেকেল ও ইজাবেল দম্পতি ড. ইউনূসকে কার্টুন সিরিজ ‘দ্য সিমসনস’-এর নির্মাতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলে ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ড. ইউনূসকে তাদের ‘গুড ফ্রেন্ড’ বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও ড. ইউনূস সরাসরি কোনো অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত বলে প্রমাণ মেলেনি, কিন্তু যে সার্কেলে এপস্টেইন বিচরণ করতেন, ড. ইউনূসও সেই একই ‘এলিট সোশ্যাল সার্কেলের’ অংশ ছিলেন। বিশেষ করে ক্লিন্টন ফাউন্ডেশনের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং ম্যাক্সওয়েল পরিবারের সাথে সখ্য তাঁকে নৈতিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে—শান্তির নোবেল বিজয়ী একজন ব্যক্তি কীভাবে এমন জঘন্য নারী পাচারকারী চক্রের হোতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে পারেন?
এপস্টেইন কি কোনো গোয়েন্দা প্রকল্পের অংশ ছিলেন?
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, জেফ্রি এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (যেমন মোসাদ বা সিআইএ) একটি বড় প্রকল্পের অংশ। তাঁর কাজ ছিল বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এমন এক ফাঁদে ফেলা যেখান থেকে তারা আর বের হতে পারবেন না। দ্বীপে বা তাঁর বাড়িতে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে রথি-মহারথিদের বিকৃত যৌন আচরণের ভিডিও করে রাখা হতো। পরবর্তীতে এই ভিডিওগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ‘ব্ল্যাকমেইল অপারেশন’।
গণমাধ্যম ও জনমতের ভূমিকা
এপস্টেইন ফাইল প্রকাশের পর দেখা গেছে, পশ্চিমা মূলধারার কিছু গণমাধ্যম বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার বা লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছে। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, গণমাধ্যমের অনেক বড় কর্তার নামও এই তালিকায় থাকতে পারে। তবে বিকল্প মাধ্যম এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা এই সত্য বের করে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও গত কয়েকদিন ধরে পত্রিকাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এটি কেবল গসিপ বা পরচর্চা নয়, বরং এটি ক্ষমতাধরদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি লড়াই।
নৈতিকতার এক বিশাল শূন্যস্থান
জেফ্রি এপস্টেইন একটি সিস্টেমের নাম, যে সিস্টেমটি আমাদের শিখিয়েছে টাকা এবং ক্ষমতা থাকলে যেকোনো অপরাধ থেকে পার পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পাপ কোনোদিন চাপা থাকে না। এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তাঁর রেখে যাওয়া নথিপত্র আজ বিশ্বের মুখোশধারী নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ড. ইউনূস থেকে শুরু করে বিল ক্লিন্টন—যাদের নাম এই তালিকায় এসেছে, তাদের সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করা না গেলেও ‘সঙ্গদোষ’ বা ‘অ্যাসোসিয়েশন’ এর যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা তাদের নৈতিক অবস্থানের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে। মানুষ আজ বুঝতে পারছে, আমরা যাদের আদর্শ হিসেবে ভাবি, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দেয়ালগুলো কতখানি অন্ধকার হতে পারে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি কেবল যৌন অপরাধের গল্প নয়, এটি হলো বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং এলিট শ্রেণির আধিপত্যবাদের নগ্ন দলিল। আগামীতে হয়তো আরও নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসবে, যা পৃথিবীকে আবারও কাঁপিয়ে দেবে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—পৃথিবীর রথি-মহারথি হোক বা সাধারণ কেউ, অপরাধের বিচার হতে হবে সমানভাবে। এপস্টেইনের এই বেড়াজাল যেন আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে, ন্যায়ের ঊর্ধ্বে কেউই নয়।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক উৎসসমূহ
এই আর্টিকেলটি তৈরিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম, আইনি নথি এবং সাম্প্রতিক ভিডিও প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে:
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম:
The New York Times: এপস্টেইনের জীবন, আইনি লড়াই এবং কারাগারের রহস্যজনক মৃত্যু সংক্রান্ত আর্কাইভ।
The Guardian: ‘Epstein Files’ এবং বিল ক্লিন্টন ও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সম্পৃক্ততা বিষয়ক বিশেষ কভারেজ।
BBC News: ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
Reuters: নিউইয়র্ক আদালতের প্রকাশিত গোপন নথিপত্রের বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট।
দেশীয় সংবাদ মাধ্যম (বাংলাদেশ):
দৈনিক প্রথম আলো: জেফ্রি এপস্টেইন ফাইল এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ।
The Daily Star: বৈশ্বিক এই কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের নাম আসার প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ।
যুগান্তর ও সমকাল: গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পাতার প্রতিবেদনসমূহ।
আইনি নথি: ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট (সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অফ নিউ ইয়র্ক) কর্তৃক অবমুক্ত করা আনসিল করা নথিপত্র (Unsealed Court Documents)।
ফ্লাইট লগ রেকর্ডস: এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমান ‘ললিটা এক্সপ্রেস’-এর যাত্রী তালিকার অফিশিয়াল ডিক্লেয়ারেশন।