
উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই আতঙ্কের একটি বিষয়। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণেই, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উগ্রপন্থীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠার সুযোগ পায়। আজকের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক জনাব মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান প্রসঙ্গক্রমে উক্ত কথাটি উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সাক্ষাৎকারটি আমরা এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে বর্তমানে এক অস্থির সময় অতিবাহিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা রাজনৈতিক সংকট এখন নতুন এক দিকে মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি গত দেড় বছরের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, এই সময়ে বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফসল। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এই পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত। গণতন্ত্রের মোড়কে যখন উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা এই সংকটের গভীরতা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।
উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে কী বোঝায়?
সাধারণত উগ্রবাদ বলতে কোনো চরমপন্থী মতাদর্শকে বোঝানো হয়। যখন এই মতাদর্শ রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করে, তখন তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলা হয়। বাংলাদেশে গত দেড় বছরে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। রাজনীতিতে সহনশীলতা কমেছে। এর পরিবর্তে পেশী শক্তি এবং ধর্মের অপব্যবহার বেড়েছে। উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন মূলত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। যখন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে উগ্রবাদী চিন্তা প্রতিফলিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব হয়। তানজীমউদ্দিন খানের মতে, এই ক্ষমতায়ন সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। এটি সমাজকে বিভক্ত করে ফেলে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে। ফলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়।
গত দেড় বছরের রাজনৈতিক পটভূমি
গত দেড় বছর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ছিল একটি ক্রান্তিকাল। এই সময়ে নির্বাচন এবং ক্ষমতার দাপট ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। বিরোধীদের দমনে অনেক ক্ষেত্রে উগ্র পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অগণতান্ত্রিক শক্তিকে তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে উগ্র গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছে। এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। যখন রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শ ছেড়ে ক্ষমতার মোহে পড়ে, তখন উগ্রবাদীরা সুযোগ নেয়। তারা মাঠ পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করেছে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
হরমুজ প্রণালি ও উত্তাল পারস্য উপসাগর: ইরানের আধিপত্য কমাতে ব্রিটেনের ড্রোন মোতায়েনের পরিকল্পনা
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং উগ্রবাদ
একটি দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী থাকলে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ—সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই শূন্যস্থানে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সহজ হয়েছে। যখন মানুষ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিচার পায় না, তখন তারা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোও জনসমর্থন হারিয়ে উগ্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এটি একটি দুষ্টচক্রের মতো কাজ করছে। তানজীমউদ্দিন খান সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন যে, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া উগ্রবাদ রোখা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেও সংকটে ফেলতে পারে।
ধর্মীয় রাজনীতির অপব্যবহার
বাংলাদেশে ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয়। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে অনেকেই ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। গত দেড় বছরে এই প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রকৃত ধার্মিকতা এবং উগ্রবাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চে এই পার্থক্য মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন রাজপথে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এটি আধুনিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের চেতনার পরিপন্থী। মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের উগ্র আদর্শের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি এবং উগ্রপন্থীদের প্রভাব
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইরের দেশগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও চিন্তার কারণ। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। উগ্রবাদ যদি সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। পশ্চিমা বিশ্বও বাংলাদেশের মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র নিয়ে সোচ্চার। তারা বারবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উগ্রবাদ জেঁকে বসে, তখন আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। বিনিয়োগ ব্যাহত হয় এবং উন্নয়ন থমকে যায়।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের বানিজ্য তদন্ত: বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কি কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে?
সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক সংকট
রাজনীতি কেবল ভোটের লড়াই নয়। এটি সংস্কৃতিরও অংশ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে সহনশীলতার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেটে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদের চর্চা বাড়ছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করেই উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন দ্রুত ঘটছে। গুজব ছড়িয়ে দাঙ্গা লাগানো বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করা এখন নিয়মিত ঘটনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা মুক্তচিন্তার চর্চায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যদি সমাজ মানসিকভাবে উগ্র হয়ে ওঠে, তবে রাজনৈতিক সমাধান কঠিন হয়ে পড়ে। তানজীমউদ্দিন খানের সাক্ষাৎকারে এই সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রটি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
কেন এই ক্ষমতায়ন বিপজ্জনক?
অনেকে মনে করতে পারেন, রাজনীতিতে সবাই সমান সুযোগ পাবে। কিন্তু উগ্রবাদ গণতন্ত্রের অংশ নয়। উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন মানেই হলো ভিন্নমতের বিনাশ। তারা যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন অন্যের কথা বলার অধিকার থাকে না। এটি একনায়কতন্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ এখানে একটি নির্দিষ্ট অন্ধকার আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের অধিকার সংকুচিত হয়। সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা হারিয়ে যায়। একটি দেশ যখন মধ্যযুগের দিকে ফিরে যেতে চায়, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। আফগানিস্তান বা সিরিয়ার মতো উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। বাংলাদেশ সেই পথে যাক, তা কারো কাম্য নয়।
প্রশাসনের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতার অভাব
রাষ্ট্র পরিচালনা করে প্রশাসন। কিন্তু প্রশাসন যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয় হয়, তবে সমস্যা বাড়ে। গত দেড় বছরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে তাদের আশকারা দেওয়া হয়েছে। এই প্রশ্রয়ই উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন-কে ত্বরান্বিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এখন প্রশ্নের মুখে। তারা কি জনগণের সেবা করছে, নাকি ক্ষমতার রক্ষক হিসেবে কাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। যখন আইন সবার জন্য সমান হয় না, তখন উগ্রবাদীরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে থাকে। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর ওপর বড় আঘাত।
তরুণ প্রজন্মের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের বিশাল এক অংশ তরুণ। তাদের চিন্তা ও চেতনার ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের হতাশ করছে। এই হতাশা থেকেই অনেকে উগ্রবাদে আকৃষ্ট হচ্ছে। চরমপন্থী দলগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তারা তরুণদের মগজ ধোলাই করছে। এভাবে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন-এর জন্য একটি নতুন কর্মী বাহিনী তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা এবং যুক্তিবাদিতার অভাব স্পষ্ট। পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তনের মাধ্যমেও উগ্রবাদী প্রভাব ফেলার চেষ্টা চলছে। তরুণদের যদি সঠিক পথে ফেরানো না যায়, তবে দেশ এক অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও উন্নয়ন বিতর্ক
সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি করে। কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন ছাড়া কেবল দালানকোঠা দিয়ে উন্নয়ন হয় না। যখন দেশে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায়। তারা এমন দেশে টাকা খাটাতে চায় না যেখানে স্থিতিশীলতা নেই। চরমপন্থা ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট করে। পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। মুদ্রাস্ফীতি চরমে। অর্থনৈতিক এই সংকটের সুযোগ নিয়েও উগ্রবাদীরা সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলছে। তারা বলছে যে বর্তমান ব্যবস্থা ব্যর্থ। এভাবে অর্থনৈতিক মন্দা এবং উগ্রবাদ একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:
সমাধান কি সম্ভব?
অবশ্যই সমাধান সম্ভব। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। প্রথমত, একটি নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় এলে উগ্রবাদ কোণঠাসা হবে। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যারা ধর্মের নামে বা রাজনীতির নামে উগ্রতা ছড়ায়, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন রুখতে হলে প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। বামপন্থী, ডানপন্থী এবং উদারপন্থীদের দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে হবে। কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং চিন্তার পরিবর্তন দরকার। মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে সঠিক ইতিহাস ও বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে।
মিডিয়ার ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মিডিয়া কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে? অনেক সময় সেন্সরশিপের ভয়ে সত্য কথা বলা যায় না। মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানের মতো সাহসীরা যখন কথা বলেন, তখন তা সবার কাছে পৌঁছানো জরুরি। মিডিয়া যদি উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে নীরব থাকে, তবে তারা পরোক্ষভাবে একে সমর্থন করছে। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উগ্রবাদের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। গুজব প্রতিরোধে সোচ্চার হতে হবে। সাংবাদিকতাকে দলদাসের ভূমিকা থেকে বের করে আনতে হবে। জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছালে তারা সচেতন হবে। আর সচেতন জনগণই উগ্রবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
সুশীল সমাজের নীরবতা
বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এক সময় খুব সরব ছিল। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। জেল-জুলুম এবং গুমের ভয়ে অনেকেই চুপ হয়ে গেছেন। এই নীরবতা উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন-এর পথ প্রশস্ত করেছে। বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো সমাজকে পথ দেখানো। তারা যদি সত্য বলতে ভয় পান, তবে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তানজীমউদ্দিন খানের সাক্ষাৎকারটি আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য একটি বার্তা। আমাদের আবার কথা বলতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে সুশীল সমাজকে নেতৃত্ব দিতে হবে। ভয়ে কুঁকড়ে থাকলে উগ্রবাদ আরও শক্তিশালী হবে।
একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থাকবে। যেখানে কথা বলার জন্য কাউকে জেল খাটতে হবে না। উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন রোধ করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের নিজেদের পরিবার থেকে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা শুরু করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা শিখতে হবে। রাজনীতিতে পেশী শক্তির বদলে যুক্তির জয়গান হতে হবে। গত দেড় বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে, উগ্রবাদীদের সাথে আপস করলে শেষ পর্যন্ত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ ও জাতির স্বার্থে আপসহীন গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আজ এক রূঢ় বাস্তবতা। এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। গত দেড় বছরে এই বিষবৃক্ষ অনেক বড় হয়েছে। এখনই যদি এর শিকড় উপড়ে ফেলা না যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের প্রয়োজন একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যেখানে আইনের শাসন থাকবে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। উগ্রবাদ ও রাজনীতির এই বিষাক্ত মিশেল বন্ধ করতে হবে। আসুন আমরা সবাই মিলে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিই। মনে রাখতে হবে, অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক না কেন, আলোর জয় নিশ্চিত।
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata
ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata