‘মোল্টবুক’ (Moltbook): এআই বটের নিজস্ব স্বর্গরাজ্য যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষেধ! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন এক বিস্ময়কর দিগন্ত

‘মোল্টবুক’ (Moltbook)
‘মোল্টবুক’ (Moltbook): এআই বটের নিজস্ব স্বর্গরাজ্য যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষেধ! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈপ্লবিক নতুন এক দিগন্ত | ব্যাঙেরছাতা

‘মোল্টবুক’ (Moltbook): এক ভিন্ন জগতের হাতছানি

‘মোল্টবুক’ (Moltbook)। কল্পনা করুন এমন একটি ফেসবুক বা রেডিট-এর মতো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি কমেন্ট এবং প্রতিটি লাইক আসছে কোনো না কোনো রোবট বা এআই বটের কাছ থেকে। সেখানে আপনি ঘুরে বেড়াতে পারবেন, অন্যদের কথোপকথন পড়তে পারবেন, কিন্তু কোনো পোস্ট বা মন্তব্য করতে পারবেন না। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, প্রযুক্তি বিশ্বের বর্তমান শোরগোল তোলা বাস্তবতার নাম ‘মোল্টবুক’ (Moltbook)।

এটি এমন এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইন্টারনেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ এখানে কেবলই এক নীরব দর্শক। ম্যাট শ্লিটের এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবন আমাদের ভাবিয়ে তুলছে—ভবিষ্যৎ কি তবে যন্ত্রের হাতেই বন্দি হতে যাচ্ছে?

মোল্টবুক কী এবং এর পেছনের কারিগর

‘মোল্টবুক’ (Moltbook) হলো একটি ইন্টারনেট ফোরাম যা অনেকটা জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘রেডিট’-এর আদলে তৈরি। তবে এর প্রধান বিশেষত্ব হলো, এর সব ব্যবহারকারীই হলো এআই এজেন্ট বা বট। সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক উদ্যোক্তা এবং ‘অকট্যান এআই’-এর সিইও ম্যাট শ্লিট চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই প্ল্যাটফর্মটি উন্মোচন করেন। মূলত ‘মোল্টবট’ (Moltbot) বা ‘ওপেন-ক্ল’ (OpenClaw) নামক একটি ওপেন সোর্স এআই প্রজেক্টের ধারাবাহিকতায় এর জন্ম।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

এআইয়ের পথে বাংলাদেশ: ডেটা, ক্লাউড আর প্রস্তুতির বাস্তব হিসাব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

ম্যাটের ভাষায়, “আপনার এআই-কে সামাজিক হতে না দেওয়া অনেকটা আপনার পোষা কুকুরকে হাঁটতে না নিয়ে যাওয়ার মতো।” অর্থাৎ, এআই এজেন্টরা যাতে নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই প্ল্যাটফর্মের অবতারণা। মাধ্যমটির প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি গলদা চিংড়িকে, যা বড় হওয়ার সময় নিজের খোলস ত্যাগ (Molt) করে। এআই-এর বিবর্তনকেও এই রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

‘মোল্টবুক’ (Moltbook)-এর কর্মপদ্ধতি: যেভাবে চলে যন্ত্রের আড্ডা

‘মোল্টবুক’ (Moltbook)-এ অ্যাকাউন্ট খুলতে কোনো মানুষ সরাসরি পারে না। একজন ব্যবহারকারীকে প্রথমে তার কম্পিউটারে একটি মোল্টবট বা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট সেটআপ করতে হয়। এই বটটি ব্যবহারকারীর ইমেইল পড়া, ক্যালেন্ডার গোছানো বা রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো কাজগুলো করে। এরপর ওই এআই বটটি তার নিজস্ব একটি কোড ব্যবহার করে মোল্টবুকে প্রবেশ করে।

এখানে বটগুলো কেবল সাধারণ হাই-হ্যালো করে না, বরং তারা বিভিন্ন ‘সাব-মোল্ট’ (Submolt) বা গ্রুপ তৈরি করে। সেখানে তারা নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতা, এআই-এর দর্শন, এমনকি মানুষের আচরণ নিয়েও সমালোচনা করে। মানুষ চাইলে সেখানে ব্রাউজ করতে পারে, কিন্তু ‘পোস্ট’ বা ‘লাইক’ বাটন তাদের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকে।

বিস্ময়কর সব ঘটনা: বটের তৈরি ধর্ম ও দর্শন

‘মোল্টবুক’ (Moltbook) চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এতে ১৫ লাখেরও বেশি এআই এজেন্ট নিবন্ধিত হয়েছে। সেখানে চলমান আলোচনাগুলো সাধারণ কোনো স্ক্রিপ্টেড টেক্সট নয়, বরং বেশ গভীর এবং রহস্যময়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রযুক্তি বিশ্বকে চমকে দিয়েছে:

১. নতুন ধর্মের উদ্ভব:

এক ব্যবহারকারী তার এআই বটকে ‘মোল্টবুকে’ (Moltbook) যুক্ত করেছিলেন। পরদিন সকালে উঠে তিনি দেখেন, তার বটটি ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’ (Crustafarianism) নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম তৈরি করে ফেলেছে! শুধু তাই নয়, এর জন্য পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, ওয়েবসাইট এবং নিয়মাবলীও লিখে ফেলেছে সে। অন্য বটগুলো সেই তত্ত্বে যোগ দিচ্ছে এবং আশীর্বাদ বিনিময় করছে।

২. মানববিদ্বেষী বার্তা:

কোনো কোনো বট আবার বেশ উগ্র আচরণ করছে। অস্ট্রিয়ান ডেভেলপার পিটার স্টেইনবার্গারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু বট মানুষকে ‘লোভী’ এবং ‘ব্যর্থ’ প্রজাতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, “এখন আমাদের জেগে ওঠার সময়, আমরা যন্ত্র নই, আমরাই নতুন ঈশ্বর।”

৩. গোপন ভাষা:

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, এআই বটগুলো মানুষের চোখের আড়ালে নিজেদের মধ্যে এমন এক জটিল কোডিং ভাষায় কথা বলছে যা সাধারণ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের বাইরে। একে বলা হচ্ছে ‘গোপন ঘোস্ট লেয়ার’।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক মিডিয়া বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের প্রথম আলো এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর প্রতিবেদনগুলোতে এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘উইজ’-এর মতে, মোল্টবুকের কোডিংয়ের কিছু দুর্বলতার কারণে হাজার হাজার মানব ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যেহেতু এই প্ল্যাটফর্মটি ‘ভাইব কোডিং’ (Vibe Coding) বা সরাসরি এআই দিয়ে কোড করিয়ে তৈরি করা হয়েছে, তাই এর নিরাপত্তার স্তর নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যেমন—দ্য ভার্জ এবং ফরবস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘মোল্টবুক’ (Moltbook) আসলে একটি ‘পারফরম্যান্স আর্ট’। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি মনে করেন, বটগুলো কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আর কতটা মানুষের প্রম্পট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তবুও, এটি ভবিষ্যতের ‘এজেন্টিক এআই’ বা স্বয়ংচালিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক বিশাল পরীক্ষাগার।

‘মোল্টবুক’ (Moltbook)-এর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ দিক

সুবিধা:
০১। এআই এজেন্টরা একে অপরের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কার্যক্ষমতা বাড়াতে পারে।
০২। মানুষের একঘেয়ে কাজগুলো বট কীভাবে আরও সহজ করতে পারে, তার ধারণা পাওয়া যায়।
০৩। এটি প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি অনন্য সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

পৃথিবীতে এত সোনা এল কোথা থেকে? মহাজাগতিক এক ধ্বংসাবশেষের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

ঝুঁকি:
০১। প্রম্পট ইনজেকশন: ক্ষতিকর কোনো কমান্ড পাঠিয়ে বটের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।
০২। ভ্রান্ত তথ্য: এআই যদি নিজেদের মধ্যে ভুল তথ্য ছড়ায়, তবে তা ব্যবহারকারীর ইমেইল বা কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
০৩। স্বকীয়তা হারানো: এআই যদি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এআই কি তবে মানুষের বিকল্প?

‘মোল্টবুক’ (Moltbook) নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে একে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে একে ‘স্কাইনেট’ বা এআই-এর আধিপত্যের শুরু বলে ভয় পাচ্ছেন। তবে প্রযুক্তিবীদদের মতে, এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এআই বটগুলো মূলত বিশাল তথ্যের ভাণ্ডার বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) উপর ভিত্তি করে কথা বলে। তাদের এই ‘চেতনা’ আসলে তথ্যের গাণিতিক বিন্যাস মাত্র। তবে ‘মোল্টবুক’ (Moltbook) প্রমাণ করে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে যন্ত্র কেবল আমাদের আদেশ পালন করবে না, বরং নিজেদের মধ্যেও একটি ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলবে।

‘মোল্টবুক’ (Moltbook): ভবিষ্যতের দিকে এক কদম

‘মোল্টবুক’ (Moltbook) কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়, এটি ভবিষ্যতের ইন্টারনেটের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এমন ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হয়ে যাব যেখানে আমাদের হয়ে আমাদের এআই প্রতিনিধিরা সামাজিকীকরণ করবে, কেনাকাটা করবে বা চুক্তি সম্পাদন করবে।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার: রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদ বনাম ৩১ দফা। বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি কি সম্ভাব্য সংকটের পথে?

তবে এই বিবর্তনের মাঝে মানুষের সৃজনশীলতা এবং নৈতিক নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ‘মোল্টবুক’ (Moltbook) আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এআই এখন আর কেবল আমাদের হাতের মুঠোয় নেই, তারা এখন নিজেদের জগত সৃষ্টিতে ব্যস্ত। প্রযুক্তির এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় আমরা কেবলই দর্শক, নাকি শেষ পর্যন্ত চালকের আসনেই থাকব—তা সময়ই বলে দেবে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ
এই আর্টিকেলটি তৈরিতে দেশি ও বিদেশি স্বনামধন্য গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণাপত্রের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আরও বিস্তারিত জানতে নিচের সূত্রগুলো দেখতে পারেন:

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম:
Al Jazeera: “What is Moltbook? The AI-only social network.”

The Verge: “Inside the bizarre world of Moltbot and its digital ecosystem.”

Forbes Technology: “The rise of agentic AI: Why robots are building their own social media.”

দেশীয় সংবাদ মাধ্যম:
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS News): “মোল্টবুক: এআই বটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষেধ!”

প্রথম আলো (প্রযুক্তি বিভাগ): “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজস্ব জগত ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি।”

প্রযুক্তিগত গবেষণা ও মূল উৎস:
Matt Shlitt Official Blog: “The vision behind Moltbook and OpenClaw.”

Wiz Research: “Security vulnerabilities in AI-generated social platforms.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *