​শেষ মুহুর্তের গোঁজামিল: অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে নীতিগত এতো গোঁজামিল কেন?

ব্যাঙেরছাতা
শেষ মুহুর্তের গোঁজামিল: অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে নীতিগত এতো গোঁজামিল কেন? | ব্যাঙেরছাতা

শেষ মুহুর্তের গোঁজামিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা সবসময়ই একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে একটি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন কোনো সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন জনসাধারণের প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন আবারও আমাদের সামনে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম বলছে— ‘শেষ মুহূর্তে অনেক গোঁজামিল’। যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছায় এবং নির্বাচনি ডামাডোল বাজতে শুরু করে, তখন তড়িঘড়ি করে নেওয়া নানাবিধ সিদ্ধান্ত, নীতিগত অসংগতি এবং বিতর্কিত প্রকল্পের অনুমোদন জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে এই ‘গোঁজামিল’ নীতিগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রেক্ষাপট: অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনগুলো

যেকোনো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক কাজ হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বর্তমান সরকার রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ও অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, যা মূলত নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। সমালোচকরা বলছেন, মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বিশাল বাজেটের প্রকল্প অনুমোদন বা আমলাতান্ত্রিক রদবদল কেবল প্রশাসনিক জটিলতাই বাড়ায় না, বরং পরবর্তী সরকারের ওপর একটি বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়।

নীতিগত গোঁজামিল ও বিতর্কিত প্রকল্প

‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’সহ দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং বৃহৎ অবকাঠামো খাতে এমন কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
১. তড়িঘড়ি করে প্রকল্প অনুমোদন: অর্থবছরের মাঝপথে এবং সরকারের বিদায়বেলায় কেন এতগুলো নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা চুক্তি সই করতে হলো, তার কোনো সদুত্তর নীতি-নির্ধারকদের কাছে নেই।
২. আর্থিক অসংগতি: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত খসড়াগুলোর অনেক ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। একে অনেক বিশ্লেষক ‘পরিহাসমূলক আচরণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
৩. আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত: শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন দপ্তরে বড় ধরনের রদবদল এবং নতুন নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বলয় তৈরির চেষ্টা একটি প্রশাসনিক গোঁজামিল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ

সরকারের এই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২ টাকা কমানোর মতো লোকদেখানো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো রোডম্যাপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, টেক্সটাইল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। অর্থনীতির এই নাজুক সময়ে বড় প্রকল্পের নামে অর্থ বরাদ্দকে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, যেখানে ব্যাংকিং খাত তারল্য সংকটে ভুগছে, সেখানে মেগা প্রকল্পের নামে অর্থায়ন কেবল একটি গোঁজামিল ছাড়া আর কিছুই নয়।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী মিডিয়ায় বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ট্রানজিশনাল ক্রাইসিস’ বা অন্তর্বর্তীকালীন সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক থিঙ্ক-ট্যাংকগুলো মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোতে গুরুত্বের সাথে প্রচার হচ্ছে। আল জাজিরা বা রয়টার্সের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের এই শেষ মুহূর্তের তৎপরতাকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে দেখছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনি জনসভাগুলোতে বারবার সতর্ক করে বলছেন যে, একটি মহল নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে তৎপর। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যারা বছরের পর বছর দেশের বাইরে ছিল, তারাই এখন প্রশাসনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। এই রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি মাঠপর্যায়ে সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার প্রতিফলন আমরা ইদানীং নির্বাচনি প্রচারণায় দেখতে পাচ্ছি।

আইনশৃঙ্খলা ও বিচারবিভাগীয় চ্যালেঞ্জ

আরেকটি বড় গোঁজামিল পরিলক্ষিত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময়ের অস্ত্রের হিসাব এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া আসামি বা অন্য আসামির কাগজ ব্যবহার করে খুনের মামলার আসামি পালানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে। এই প্রশাসনিক শিথিলতা প্রমাণ করে যে, সরকারের চেইন অব কমান্ডে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।
ব্লগার ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের পর্যবেক্ষণ
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেকোনো সরকার যখন বিদায় নেয়, তারা চায় তাদের অনুগতদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে যেতে এবং এমন কিছু প্রকল্প রেখে যেতে যা থেকে তাদের স্বার্থরক্ষা হয়। কিন্তু একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষ এটি প্রত্যাশা করেনি। সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে রক্ত দিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই ‘গোঁজামিল’ পূর্ণ সিদ্ধান্তে পাওয়া যাচ্ছে না।

​শেষ মুহুর্তের গোঁজামিল: ভবিষ্যৎ প্রভাব ও করণীয়

এই তড়িঘড়ি করে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং অসমাপ্ত প্রকল্পের বোঝা জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ঘটাবে। তাই এখনই প্রয়োজন:
* সমস্ত বিতর্কিত প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত রাখা।
* নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া যাতে কোনো প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভোট হতে পারে।
* আমলাতন্ত্রের ওপর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে আনা।
* অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের সাথে সংলাপে বসা।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনসমর্থিত সরকার চায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল কেবল সেই পথটি সুগম করা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রকল্পের পাহাড় আর নীতিগত অসংগতির যে ‘গোঁজামিল’ তারা তৈরি করেছে, তা কেবল তাদের ভাবমূর্তিকে সংকটাপন্নই করছে না, বরং রাষ্ট্রকেও একটি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় কোনো সরকারই অমর নয়, তবে তাদের রেখে যাওয়া কাজগুলোই তাদের ভালো-মন্দের বিচার করে। আশা করা যায়, শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং সব ধরনের অস্বচ্ছতা দূর করে একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবেশ তৈরি হবে। নচেৎ এই ‘গোঁজামিল’ আগামী দিনের রাজনীতির জন্য এক অশনি সংকেত হয়েই থাকবে।
দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ

১. জাতীয় সংবাদ মাধ্যম:
বাংলাদেশ প্রতিদিন: “শেষ মুহূর্তে অনেক গোঁজামিল“, প্রধান প্রতিবেদন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
প্রথম আলো: “অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী প্রকল্প ও বাজেট বিশ্লেষণ”, বিশেষ সম্পাদকীয়, জানুয়ারি ২০২৬।
দ্য ডেইলি স্টার (বাংলা): “প্রশাসনিক রদবদল ও নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ: একটি পর্যালোচনা”, জানুয়ারি ২০২৬।

২. আন্তর্জাতিক সংবাদ ও সংস্থা:
Al Jazeera English: “Bangladesh Transition: Economic Hurdles and Political Uncertainty”, Regional Report, January 2026.
Reuters: “Election Fever in Bangladesh: Concerns over Governance and Stability”, Analysis by South Asia Bureau.

৩. গবেষণা ও আর্থিক প্রতিবেদন:
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB): “অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সুশাসন ও স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ২০২৬”।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD): “বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামষ্টিক নীতি পর্যালোচনা”।

৪. সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) প্রকাশিত নির্বাচনি আচরণবিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশনাবলী।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA) এর সাম্প্রতিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও ধর্মঘট সংক্রান্ত ঘোষণা।

তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকারের এইসব গোঁজামিলপূর্ণ সিদ্ধান্তে আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখে জানান। আপনার মতামত আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *