ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত: পরবর্তীতে কে ধরবেন ইরানের মাস্তুল, বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত: পরবর্তীতে কে ধরবেন ইরানের মাস্তুল, বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে? | ব্যাঙেরছাতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলর বর্বরোচিত হামলায় নিহত হয়েছেন, সেই সংবাদ আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ইরানে কী ঘটতে পারে? নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে কে নেবেন ইরানের শাসন ক্ষমতার দায়িত্ব? কিংবা খামেনির আকস্মিক এই মৃত্যুর ঘটনা এশিয়া মহাদেশ ও বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়বে- এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বিশ মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ পূর্বক আমরা তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং শিয়া মুসলিম বিশ্বের প্রধান শক্তি ইরানের আকাশে এখন অনিশ্চয়তার ঘনঘটা। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের মাস্তুল শক্ত হাতে ধরে রাখা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আকস্মিক প্রয়াণ বা নিহত হওয়ার সংবাদ বিশ্বজুড়ে এক কম্পন সৃষ্টি করেছে। কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ এই ঘটনার পর আমূল বদলে যেতে পারে। খামেনি ছিলেন আধুনিক ইরানের স্তম্ভ, যার নির্দেশে চলত দেশটির পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি। তার অনুপস্থিতিতে তেহরানের মসনদে কে বসবেন এবং এই ক্ষমতার পরিবর্তন বিশ্বমঞ্চে কী বার্তা দেবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ​খামেনির অবসান: একটি যুগের সমাপ্তি

একনজরে আর্টিকেলটির সারাংশ দেখুন: hide

​আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে ইরান যেমন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করেছে, তেমনি লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে নিজের প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। তার নিহত হওয়া বা প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়, বরং একটি আদর্শিক কাঠামোর বড় ধরনের ধাক্কা। এই পরিস্থিতিতে ইরান এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

​সংবিধান কী বলে: অস্থায়ী নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি নির্বাচন

​ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যদি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন বা মারা যান, তবে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত একটি উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিল বা পরিষদ সাময়িকভাবে দেশ পরিচালনা করবে।

​এই অস্থায়ী কাউন্সিলে সাধারণত তিনজন সদস্য থাকেন:

১. ইরানের প্রেসিডেন্ট (যদি তিনি বর্তমান থাকেন)।

২. বিচার বিভাগের প্রধান।

৩. গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি।

​এই তিন সদস্যের কমিটিই অস্থায়ীভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর ক্ষমতা চর্চা করবেন এবং পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবেন।

​অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস: আসল সিদ্ধান্ত যেখানে হয়

​ইরানে পরবর্তী স্থায়ী নেতা নির্বাচনের চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ সভার হাতে। এই সভায় ৮৮ জন সদস্য থাকেন, যারা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ বা মুজতাহিদ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য এই সভার সদস্যদের মধ্যে আলোচনা ও গোপন ভোট হয়।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

দেশের নতুন গভর্নর নিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা নাকি অশনিসংকেত?

​প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পরিষদকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে, কারণ খামেনির মতো প্রভাবশালী নেতার শূন্যতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

​কারা হচ্ছেন খামেনির উত্তরসূরি: আলোচনায় যাদের নাম

​ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পদের জন্য বেশ কয়েকজনের নাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। যদিও ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহল অত্যন্ত রহস্যময়, তবুও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি নাম সামনে এনেছেন:

​১. মোতজাবা খামেনি:

আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোতজাবা খামেনি বর্তমানে পর্দার আড়ালে থেকে ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ‘রেভোলিউশনারি গার্ডস’ (IRGC) এর ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখেন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তাকেই পরবর্তী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। তবে ইরানের ধর্মীয় মহলে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের কিছুটা বিরোধিতা রয়েছে।

​২. আলি রেজা আরাফি:

ইরানের প্রভাবশালী আলেম এবং বর্তমান অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার প্রতি ধর্মীয় এলিটদের বড় একটি অংশের সমর্থন রয়েছে বলে শোনা যায়।

​৩. মোহাম্মদ মাহদি মিরবাকেরি:

কট্টরপন্থী এই নেতাকেও অনেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। তিনি খামেনির আদর্শের কট্টর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

​উল্লেখ্য যে, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রধান দাবিদার মনে করা হতো, কিন্তু তার অকাল মৃত্যুতে সমীকরণ এখন পাল্টে গেছে।

​অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

​ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর প্রয়াণের পর ইরানে ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একদিকে কট্টরপন্থী রেভোলিউশনারি গার্ডস, অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীল আলেম সমাজ—উভয় পক্ষই চাইবে তাদের অনুগত কাউকে এই পদে বসাতে। এছাড়া সাধারণ ইরানিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে ক্ষোভ (অর্থনৈতিক সংকট ও স্বাধীনতার অভাব) রয়েছে, তা এই ক্রান্তিকালে গণবিক্ষোভের রূপ নিতে পারে। ফলে নতুন নেতাকে কেবল বিদেশনীতি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনেও কঠোর হতে হবে।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো: স্থায়িত্ব নাকি সাংবিধানিক সংকটের পথে যাত্রা?

​বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?

​ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর পরিবর্তনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী:

​১. মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা:

লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ফিলিস্তিনের হামাস—এই দলগুলো সরাসরি ইরানের মদতপুষ্ট। নতুন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যদি তাদের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেন বা সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আনেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নকশা বদলে যাবে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

​২. বিশ্ব তেলের বাজার:

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী করে দিতে পারে। খামেনি পরবর্তী উত্তেজনায় যদি তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।

​৩. পারমাণবিক কর্মসূচি:

ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন অনেকাংশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর সবুজ সংকেতের ওপর নির্ভরশীল। নতুন নেতা যদি খামেনির চেয়েও কট্টর হন, তবে ইরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হবে।

​৪. পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অধীর আগ্রহে পর্যবেক্ষণ করছে তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন। যদি কোনো উদারপন্থী বা মধ্যপন্থী নেতা (যদিও তার সম্ভাবনা ক্ষীণ) ক্ষমতায় আসেন, তবে পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। নতুবা নিষেধাজ্ঞা ও বৈরিতার মাত্রা আরও বাড়বে।

​রেভোলিউশনারি গার্ডস (IRGC)-এর ভূমিকা

​ইরানের আসল চালিকাশক্তি হলো আইআরজিসি। তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতিরও বড় নিয়ন্ত্রক। পরবর্তী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তাতে আইআরজিসি-র মতামতই হবে চূড়ান্ত। তারা এমন কাউকে সমর্থন দেবে যে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে, আইআরজিসি সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার লাগাম নিজেদের হাতে নিতে পারে অথবা তাদের অনুগত কোনো পুতুল নেতাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বসাতে পারে।

​ইরানি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ প্রতিবাদ

​গত কয়েক বছরে মাহসা আমিনি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইরানে বড় বড় বিক্ষোভ হয়েছে। সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তন চায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর মৃত্যুর খবর সাধারণ মানুষকে সড়কে নামতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। যদি রাষ্ট্র এই বিক্ষোভ দমন করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। তবে খামেনি পরবর্তী নেতৃত্ব সম্ভবত শুরুতেই অত্যন্ত কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।

​আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাশিয়া-চীন ফ্যাক্টর

​ইরান বর্তমানে রাশিয়া ও চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করে আসছে। নতুন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যদি রাশিয়ার সাথে এই ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখেন, তবে তা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য দুঃস্বপ্ন হবে। চীনও ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামোতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ফলে ইরানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চীন ও রাশিয়ার জন্য অপরিহার্য। তারা নিশ্চয়ই চাইবে তেহরানের ক্ষমতায় এমন কেউ আসুক যে পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান বজায় রাখবে।

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অন্য আর্টিকেল পড়ুন:

সাবেক উপদেষ্টাদের দুর্নীতি: ক্ষমতার আড়ালে অর্থপাচার ও অনিয়মের পাহাড় সমান অভিযোগ

​আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু বা নিহত হওয়ার ঘটনাটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকবদল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি যে বিশাল প্রভাব রেখে গেছেন, তার অভাব পূরণ করা সহজ হবে না। তবে ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংবিধানে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাতে দেশটিতে হঠাৎ করে বড় কোনো অরাজকতা সৃষ্টি না হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ লড়াই এবং বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ পরিস্থিতিকে যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

​পরিশেষে বলা যায়, পরবর্তী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যিনিই হোন না কেন, তাকে একই সাথে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন, জনগণের অসন্তোষ দমন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবিলা করতে হবে। ইরানের মাস্তুল এখন কার হাতে যাবে, তা কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবে এটি নিশ্চিত যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এর পদটি কেবল ইরানের ভাগ্য নয়, বরং আগামী দশকের বিশ্ব নিরাপত্তার গতিপথও নির্ধারণ করবে। খামেনি পরবর্তী ইরান কি আরও বেশি কট্টর হবে, নাকি সংস্কারের পথে হাঁটবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো বিশ্ব।

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজটি ফলো করুন: Bangerchata

ব্যাঙেরছাতা ওয়েবসাইটের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: Bangerchata

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *