বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় এবং অনিশ্চিত সময় পার হচ্ছে এখন। ২০২৪ সালের আগস্টের “তথাকথিত” গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। সম্প্রতি বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম—ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স এবং আল জাজিরা—বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং সেখানে জামাতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে এমন কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা সচেতন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা একটি ‘ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড’ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক খেলা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি দীর্ঘ সময় কোণঠাসা হয়ে থাকা জামাতে ইসলামী এখন আমেরিকার সবুজ সংকেত এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়াতলে ক্ষমতার মসনদে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্ফোরক দাবি ও ফাঁস হওয়া অডিও
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে নারী সাংবাদিকদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অডিও রেকর্ড তাদের হাতে এসেছে। সেই অডিওতে ওই কূটনীতিককে বলতে শোনা গেছে যে, বাংলাদেশ ক্রমেই ইসলামপন্থী ভাবধারার দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া নির্বাচনে জামাতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল পেতে পারে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন জামাতকে বন্ধু হিসেবে পেতে আগ্রহী। মার্কিন ওই কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জামাত যদি ক্ষমতায় আসে তবে ওয়াশিংটন তাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী, যদি তারা মার্কিন নির্দেশনার বাইরে না যায়।
ওয়াশিংটন পোস্ট আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামাতের ছাত্র সংগঠনকে মিডিয়ার সামনে বেশি করে আনার পরামর্শ দিয়েছেন এবং দলটির নেতাদের কী করতে হবে তা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ‘পুতুল সরকার’ বসানোর নীল নকশা কি না, সেই প্রশ্নকে জোরালো করে তুলেছে।
রয়টার্স ও আল জাজিরার বিশ্লেষণ: জামাতের পুনরুত্থান
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের মূলধারার মধ্যপন্থী নাগরিকরা জামাতের এই দ্রুত উত্থানে শঙ্কিত। দীর্ঘ এক দশক নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা থাকার পর জামাত এখন নতুন উদ্যমে সংগঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)-এর একটি জনমত জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স ও আল জাজিরা বলছে, বর্তমানে জামাতের জনসমর্থন বিএনপির প্রায় কাছাকাছি (যথাক্রমে ২৯% ও ৩৩%)।
আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এই নির্বাচনে জামাতের সামনে এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ডক্টর ইউনুসের সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখায় নির্বাচনী মাঠ এখন মূলত বিএনপি ও জামাতের দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আল জাজিরার মতে, এটি জামাতের জন্য একটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তন হতে যাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করবে।
ইউনুসের ভূমিকা ও ‘সাজানো’ নির্বাচনের অভিযোগ
সমালোচকরা বলছেন, ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের কথা বলছে, তার আড়ালে কি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে? আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা এবং জামাতের ওপর থেকে প্রশাসনিক চাপ সরিয়ে নেওয়াকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন একটি নিয়ন্ত্রিত বা ‘সাজানো’ নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে। যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো স্পষ্টভাবে বলছে যে আমেরিকা জামাতকে ক্ষমতায় দেখতে চায় এবং ডক্টর ইউনুস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে পশ্চিমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, তখন এই সমীকরণ মেলালে একটি বিশেষ নকশা ফুটে ওঠে।
ইউনুস সরকারের অধীনে আয়োজিত এই নির্বাচনে যদি জামাত উল্লেখযোগ্য আসন পায় বা ক্ষমতার অংশীদার হয়, তবে তা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য কতটুকু সুখকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে যেখানে মার্কিন কূটনীতিকরা বলছেন যে জামাত যদি তাদের নির্দেশ অমান্য করে তবে তারা পোশাক শিল্পের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে—এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে আমেরিকা তার নিজের স্বার্থে একটি আজ্ঞাবহ সরকারকে বাংলাদেশে দেখতে চায়।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের টানাপড়েন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
জামাতের এই সম্ভাব্য ক্ষমতালাভ কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, জামাতের সাথে আমেরিকার এই মাখামাখি ভারত ও মার্কিন সম্পর্কের মধ্যে বড় ফাটল তৈরি করতে পারে। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই জামাতকে পাকিস্তানের মিত্র এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।
যদি আমেরিকার সহায়তায় জামাত ক্ষমতায় আসে, তবে দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের এক নাটকীয় উন্নতি দেখা যেতে পারে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ কি বৃহৎ শক্তিগুলোর ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে?
অর্থনৈতিক চাপ ও ব্ল্যাকমেইল কৌশল
ওয়াশিংটন পোস্টের অডিও অনুসারে, আমেরিকা জামাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার ২০ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কূটনীতিকের ভাষায়, “জামাত যদি শরীয়া আইন চাপিয়ে দেয় বা নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, তবে অর্ডার বন্ধ করে দেওয়া হবে।” এটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকা একটি ‘ইসলামিক’ মোড়কের সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে তাকে অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কি কেবল জনগণের রায় হবে, নাকি এটি হবে পর্দার অন্তরালে থাকা পরাশক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন? ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সাধারণ দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি সত্যিই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ তৈরি করতে ব্যর্থ হয় এবং কোনো বিশেষ আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জামাতকে ক্ষমতার সিঁড়ি তৈরি করে দেয়, তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকটের মুখে পড়বে।
আমেরিকা যদি তার নিজের স্বার্থে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কোনো আশীর্বাদ বয়ে আনবে না। এখন দেখার বিষয়, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে, নাকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আশঙ্কা সত্যি করে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে এক নতুন মেরুকরণের সাক্ষী হবে প্রিয় বাংলাদেশ। দিনশেষে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাগ্য তার জনগণের হাতেই থাকা উচিত, কোনো বিদেশী শক্তির প্রেসক্রিপশনে নয়।
এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের আলোকে একটি বিশ্লেষণাত্মক উপস্থাপন মাত্র।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক নথি
এই নিবন্ধটি তৈরিতে নিম্নলিখিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে:
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট (The Washington Post):
প্রতিবেদন শিরোনাম: “U.S. seeks to be friends with Bangladesh’s once-banned Islamist party” (প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০২৬)।
মূল বিষয়: ঢাকা দূতাবাসের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড এবং জামাতে ইসলামীর প্রতি মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থনের বিশ্লেষণ।
রয়টার্স (Reuters):
প্রতিবেদন শিরোনাম: “Bangladesh’s Islamist party revival sparks concern among moderates ahead of elections” (প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০২৬)।
মূল বিষয়: জামাতের পুনর্গঠন, জনমত জরিপ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্বেগের চিত্র।
আল জাজিরা (Al Jazeera): প্রতিবেদন শিরোনাম: “The dramatic comeback of Jamaat-e-Islami in Bangladesh politics” (প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০২৬)।
মূল বিষয়: আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপি ও জামাতের প্রতিদ্বন্দিতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা।
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI): ডিসেম্বর ২০২৫-এ পরিচালিত দেশব্যাপী জনমত জরিপ (বাংলাদেশ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয় সমর্থন বিষয়ক)।
আটলান্টিক কাউন্সিল (Atlantic Council): দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মন্তব্য (সূত্র: রয়টার্স ও ওয়াশিংটন পোস্ট সাক্ষাৎকার)।