বিশ্বমঞ্চে একা আমেরিকা? একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং একই সাথে বিতর্কিত নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁর গৃহীত নীতিগুলো বিশ্বব্যবস্থায় এক বিশাল কম্পন সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমেরিকা যে উদার ও বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (America First) নীতি সেই কাঠামোকে আমূল বদলে দিচ্ছে। সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত আবু নাসের-এর একটি বিশ্লেষণধর্মী কলামে ফুটে উঠেছে এক আশঙ্কাজনক চিত্র—আমেরিকা কি তবে ক্রমশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে? শক্তির প্রদর্শন আর মিত্রদের প্রতি উদাসীনতা কি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবকে খর্ব করছে? এই প্রবন্ধে আমরা ট্রাম্পের সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির স্বরূপ এবং বিশ্বরাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শক্তির উগ্র প্রদর্শন বনাম কূটনৈতিক সংযম
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের মূলে রয়েছে রুক্ষ ও অসংগত শক্তির ব্যবহার। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক যুদ্ধের পর ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ ঘোষণা করেছিলেন, যা ছিল মূলত শক্তির এক কৃত্রিম বিজয়োল্লাস। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন যেন সেই একই পথে হাঁটছে। নিজেকে একজন ‘আয়রনম্যান’ বা লৌহমানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি এমন সব ভাষা ও কৌশল ব্যবহার করছেন, যা শত্রু তো বটেই, এমনকি মিত্রদেরও আতঙ্কিত করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শক্তির সাথে সংযম এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে শৃঙ্খলা—এই দুইয়ের সংমিশ্রণই ছিল আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের প্রধান শক্তি। কিন্তু ট্রাম্প সেই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তিকে নিয়মিত ভয় দেখাচ্ছেন এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর অন্যায্য বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ করছেন। এর ফলে যা ঘটছে তা হলো—প্রতিপক্ষরা আরও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং মিত্ররা আমেরিকার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে।
ইউরোপের সাথে দূরত্বের সৃষ্টি: ফাটল ধরছে ন্যাটোর আস্থায়
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো (NATO)। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইউরোপ ছিল আমেরিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কৌশলগত মিত্র। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেছেন যে, ইউরোপ এখন আর বন্ধু নয়, বরং বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ। তিনি ন্যাটো মিত্রদের ‘রক্তচোষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দোহাই দিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউরোপ এখন আর নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে পারছে না। ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর এবং স্বাধীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ভাবছে। ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, ওয়াশিংটন এখন আর গোপনে নয়, বরং প্রকাশ্যে ইউরোপকে দুর্বল করতে চায়। ফলে ব্রাসেলস এখন আমেরিকার বিকল্প হিসেবে চীন বা অন্যান্য উদীয়মান শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে আমেরিকাকেই আটলান্টিকের ওপাড়ে একা করে দিচ্ছে।
বাণিজ্যিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রধান অস্ত্র হলো বাণিজ্যিক শুল্ক। তিনি মেক্সিকো, কানাডা এবং চীনের পাশাপাশি বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর ওপরও উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করছেন। ট্রাম্প মনে করেন, এই রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে তিনি আমেরিকার হারানো শিল্পকারখানা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিশ্ব অর্থনীতি এখন এতটাই আন্তঃসংযুক্ত যে, একতরফা শুল্ক আরোপের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ভেঙে পড়ছে।
অন্যায্য শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে ডলারের আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক দেশ এখন ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলারের বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য করার কথা ভাবছে। যখন একটি পরাশক্তি তার অর্থনৈতিক প্রভাবকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মিত্রদের শোষণ করতে চায়, তখন সেই মিত্ররা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প খোঁজে। ট্রাম্পের এই নীতি আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে সাময়িক সুবিধা দিলেও কৌশলগতভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণকে হুমকির মুখে ফেলছে।
উদার বিশ্বব্যবস্থার অবসান ও ‘গ্রোসরাউম’ তত্ত্ব
রাজনৈতিক চিন্তক কার্ল স্মিটের ‘গ্রোসরাউম’ (Großraum) বা বৃহৎ আঞ্চলিক ক্ষেত্র তত্ত্বের সাথে ট্রাম্পের বর্তমান নীতির অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। স্মিট মনে করতেন, প্রতিটি অঞ্চলে একটি প্রধান শক্তি থাকবে যারা সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিসর নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে শক্তির ভারসাম্যই হবে মুখ্য। ট্রাম্প যেন সেই ১৯৩৩ সালের আগের বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাইছেন, যেখানে বহুপাক্ষিকতা বা জাতিসংঘের মতো সংস্থার কোনো গুরুত্ব নেই।
তিনি ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছেন, পানামা খাল বা গ্রিনল্যান্ডের মতো অঞ্চল দখলের কথা বলছেন। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই উদার নৈতিক বিশ্বব্যবস্থার (Liberal World Order) কবর রচনার শামিল, যা আমেরিকা নিজেই গড়ে তুলেছিল। ট্রাম্পের এই ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আচরণের ফলে রাশিয়া এবং চীন তাদের নিজস্ব প্রভাববলয় বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। আমেরিকা যখন বিশ্বমঞ্চ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে বেইজিং ও মস্কো।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের নীতির প্রভাব
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ট্রাম্পের এই পরিবর্তনশীল নীতি এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতি অনুযায়ী, আমেরিকা এখন গণতন্ত্র প্রচারের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাজনৈতিক চাপের ঝুঁকি কমছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক শুল্কের কারণে রপ্তানি খাত সংকটে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প যদি রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আমেরিকার এই অন্তর্মুখী নীতির ফলে বাংলাদেশ যদি ওয়াশিংটনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে, তবে নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তিগত যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজনীতি
ট্রাম্পের রাজনীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো প্রযুক্তিগত বিভাজন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং চিপ প্রযুক্তির ওপর মার্কিন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চান। কিন্তু ইউরোপের হাতেও ‘এএসএমএল’ (ASML)-এর মতো অত্যাধুনিক চিপ তৈরির প্রযুক্তি রয়েছে। ট্রাম্প যদি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও মিত্রদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ান, তবে বিশ্ব এক ভয়াবহ ‘টেক-কোল্ড ওয়ার’ বা প্রযুক্তিগত শীতল যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে। এতে করে বৈশ্বিক উদ্ভাবন থমকে যেতে পারে এবং আমেরিকা তার প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতের আমেরিকা ও বিশ্ব
পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে ‘আবারও মহান’ (Make America Great Again) করার স্বপ্ন দেখালেও তাঁর গৃহীত পথটি আমেরিকাকে ক্রমশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কোনো শক্তিই কেবল পেশিশক্তি দিয়ে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন নৈতিক বৈধতা ও বিশ্বস্ত মিত্র। ট্রাম্পের ভাষায় উত্তেজনা আছে, কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষীয়মাণ।
আমেরিকা যদি তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের দূরে ঠেলে দেয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবজ্ঞা করে, তবে বিশ্ব হয়তো খুব শীঘ্রই একটি ‘আমেরিকা-পরবর্তী’ (Post-American) যুগে প্রবেশ করবে। যেখানে আমেরিকা থাকবে কেবল উত্তর আমেরিকার একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে, কিন্তু বিশ্বনেতা হিসেবে নয়। ট্রাম্পের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে নাকি দেশটিকে এক অন্ধকার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে—তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে বর্তমান লক্ষণগুলো বলছে, আমেরিকার এই ‘একা হয়ে যাওয়ার’ মাশুল হয়তো কেবল মার্কিনিদের নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হতে পারে।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১. মূল উৎস (Primary Source):
নাসের, আবু। (২০২৪, ডিসেম্বর)। “ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন“। প্রথম আলো (অনলাইন কলাম)।
২. আন্তর্জাতিক সংবাদ ও বিশ্লেষণ (International Media):
The New York Times: “Trump’s ‘America First’ vs. Global Alliances” (ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক মিত্রতা ও বাণিজ্যিক শুল্ক সংক্রান্ত প্রতিবেদনসমূহ)।
The Economist: “The Post-American World: Challenges under a Trump Administration” (ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ)।
Reuters: “Trade War 2.0: Impact of Tariffs on China and Mexico” (ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক বাজারের প্রতিক্রিয়া)।
৩. কৌশলগত ও তাত্ত্বিক রেফারেন্স (Strategic References):
Foreign Affairs Magazine: “The End of the Liberal Order?” (উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার সংকট বিষয়ক নিবন্ধ)।
Carl Schmitt’s Political Theory: ‘Grossraum’ বা বৃহৎ আঞ্চলিক ক্ষেত্র তত্ত্বের সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রয়োগ সংক্রান্ত একাডেমিক জার্নাল।
৪. সংশ্লিষ্ট সংস্থা (Organizations):
Council on Foreign Relations (CFR): মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলোর নিয়মিত আপডেট।
NATO Public Records: ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট এবং সদস্য দেশগুলোর সাথে আমেরিকার সাম্প্রতিক সম্পর্কের নথিপত্র।