বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ: বিএনপি কি তবে আওয়ামী লীগের অভাব বোধ করছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ। রাজনীতির দৃশ্যপট গত কয়েক মাসে যে নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা সাধারণ জনগণের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ৫ই আগস্টের “তথাকথিত” ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, অতি সম্প্রতি বিএনপি নেতাদের কিছু বক্তব্য এবং রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে গত দেড় দশক ধরে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করাই ছিল বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে হঠাৎ করেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মুখে আওয়ামী লীগের প্রতি এক ধরণের ‘সহানুভূতি’ বা ‘আক্ষেপের সুর’ দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের রাজনীতির চিরচেনা ‘নৌকা বনাম ধানের শীষ’ প্রতিদ্বন্দিতা কি তবে গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল? নাকি পর্দার আড়ালে নতুন কোনো বৃহৎ শক্তির উত্থান ঠেকাতে দুই মেরুর দল দুটি কাছাকাছি আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

পটভূমি: পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ময়দানে প্রায় অনুপস্থিত। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা হয় আত্মগোপনে, না হয় কারাগারে। এই শূন্যতার সুযোগে রাজনীতিতে এক ধরণের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নির্বাচনী সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য এই ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিকেই সামনে এনেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, আগে নির্বাচনে নৌকা এবং ধানের শীষের যে প্রতিদ্বন্দিতা ছিল, এবার তা নেই। তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন, “নৌকার যিনি কাণ্ডারী, তিনি নেতাকর্মীদের ফেলে ভারতে পালিয়ে গেছেন, দিল্লিতে গিয়ে বসে আছেন। আমাদের বিপদে ফেলে গেছেন।” এই ‘বিপদে ফেলে যাওয়া’ শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি কেন মনে করছে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তাদের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ: গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের দোহাই নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

রাজনীতিতে কোনো কিছুই অকারণে ঘটে না। বিএনপি যখন বলছে নৌকা এবং ধানের শীষের লড়াই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ছিল, তখন এর পেছনে গভীর কোনো কৌশল থাকতে পারে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ভোট ব্যাংক বাংলাদেশে রয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলে এই ভোটগুলো কোথায় যাবে? বিএনপি কি তবে সেই উদারপন্থী বা আওয়ামী ঘরানার ভোটগুলো নিজেদের বাক্সে টানার চেষ্টা করছে? দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ বিহীন ময়দানে বর্তমানে একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে, যাদের বিএনপি ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বা ‘চরমপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে সরাসরি বলেছেন যে, যারা স্বাধীনতার সময় বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন সরকার গঠন করতে চায়। অর্থাৎ, জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক শক্তি বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে।

জামায়াত ফ্যাক্টর এবং বিএনপির উদ্বেগ

৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রম অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা ‘প্ল্যান এ, বি, সি’ নিয়ে এগুচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপির ভেতরেও এই নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা যায়, লন্ডনে বিএনপির এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে তারেক রহমান যখন প্রশ্ন করেছিলেন যে, নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তারা বিরোধী দলে কাকে দেখতে চায়—তখন প্রায় ৬০ শতাংশ নেতা আওয়ামী লীগকে এবং ৪০ শতাংশ নেতা জামায়াতকে বিরোধী দল হিসেবে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। এর কারণ স্পষ্ট, বিএনপি মনে করে আওয়ামী লীগের সাথে তাদের লড়াই রাজনৈতিক এবং আদর্শিক হলেও, জামায়াতের সাথে লড়াইটি অনেক বেশি অস্তিত্ব রক্ষার এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতার।

সংখ্যালঘু কার্ড এবং স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

মির্জা ফখরুল তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের আশ্বস্ত করেছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সবাই সমান অধিকার পাবে। এটি শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা দেওয়া যে—আওয়ামী লীগ না থাকলেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ। আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল ধরে নিজেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রচার করে এসেছে। বিএনপি এখন সেই জায়গাটি দখল করতে চায় এবং প্রমাণ করতে চায় যে, তারা কোনো চরমপন্থী শক্তির সাথে নেই।

শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নিরবতা: অন্য কোনো ইঙ্গিত?

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্প্রতি দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে শেখ হাসিনার অডিও বার্তা কিংবা আল জাজিরায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তারা বিএনপির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কোনো কথা বলেননি। জয় বরং বেশ কৌশলে এবং স্মার্টনেসের সাথে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। একইভাবে মির্জা ফখরুলও শেখ হাসিনাকে সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে তার ‘পালিয়ে যাওয়া’র সমালোচনা করছেন যা তাদের দলকেও বিপদে ফেলেছে বলে দাবি করছেন। এই পারস্পরিক ‘নমনীয়তা’ কি অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো এক ধরণের গোপন সমঝোতা বা ‘ন্যাশনাল ইউনিটি’র ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিশেষ করে যখন উভয় দলই মনে করছে যে, বর্তমানে দেশে এমন এক শক্তি বাড়ছে যা উভয়ের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

আন্তর্জাতিক শক্তির খেলার মাঠ

বাংলাদেশ বর্তমানে ভূ-রাজনীতির এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে। ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক রিপোর্ট এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন আর কেবল স্থানীয় নেতাদের হাতে নেই। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে যেমন সংস্কারের কথা বলছে, অন্যদিকে রাজপথের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। ‘মব জাস্টিস’ বা মব ক্রিয়েট করে নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধ করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তাকে বিএনপিও এক ধরণের ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। কারণ আজ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে কাল যে অন্য কোনো দল হবে না, তার গ্যারান্টি নেই।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কি ঐক্য সম্ভব?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঞ্জুরুল আলম পান্না তার সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি বিতর্কিত কিন্তু সাহসী প্রশ্ন তুলেছেন—”এই অশুভ শক্তিকে বধ করার জন্য রাজপথে কি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে?” ২০২৪-এর আন্দোলনে অনেক আওয়ামী সমর্থক বা সাধারণ মানুষও শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের পর যে ‘চরমপন্থা’র উত্থান তারা দেখছেন, তাতে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এখন শঙ্কিত। আওয়ামী আমলের দুর্নীতি ও নির্যাতন সত্য হলেও, বর্তমানে মৌলবাদী শক্তির যে আস্ফালন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা পশ্চিমাদের নোংরা খেলার অংশ হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এই সংকট কাটাতে দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মধ্যে ন্যূনতম একটি ঐকমত্য দেশের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণ এখন আর আগের মতো সরল নয়। মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে আওয়ামী লীগের প্রতি যে পরোক্ষ ‘আক্ষেপ’ শোনা গেছে, তা রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নাকি বাধ্যবাধকতা—তা সময় বলবে। তবে এটি সত্য যে, একটি টেকসই গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল আবশ্যক। নৌকা আর ধানের শীষের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দিতা এই দেশের রাজনীতির যে মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল, তা ভেঙে যাওয়ার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে চরমপন্থার আগাছা জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিএনপি হয়তো বুঝতে পারছে যে, আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অর্থ হলো এমন এক শক্তিকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেওয়া, যা শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেও গ্রাস করবে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের পথে হাঁটা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, পরাশক্তিগুলোর খেলার ছকে পড়ে বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনীতি হয়তো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক সূত্রাবলী
আর্টিকেলটি তৈরিতে নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করা হয়েছে:

ভিডিও সূত্র: মঞ্জুরুল আলম পান্না;পাল্টে যাচ্ছে হিসাব! হঠাৎ কেন আ. লীগের প্রশংসায় বিএনপি!” (জানুয়ারি ২৬, ২৬), মানচিত্র (Manchitro) ইউটিউব চ্যানেল।

বক্তব্য ও সংবাদ পরিক্রমা:
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক সমীকরণ বিষয়ক সাম্প্রতিক ভাষণ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও বার্তা (দিল্লি ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব) এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের আল জাজিরায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকার (জানুয়ারি ২০২৬)।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম:
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট (Washington Post) এবং আল জাজিরা (Al Jazeera)-এর বিশেষ প্রতিবেদনসমূহ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী) রণকৌশল এবং ৫ই আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় কলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *