বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিওপলিটিক্স ও জুলাই আন্দোলন: একটি গভীর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিওপলিটিক্স। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বরাবরই ঘটনাবহুল এবং চড়াই-উতরাইপূর্ণ। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের “তথাকথিত” ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ৫ই আগস্টের সরকার পতন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেমন জাতীয় সংহতি তৈরি হয়েছে, তেমনি এর নেপথ্যের কারিগর, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং জিওপলিটিক্যাল বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে শুরু হয়েছে তাত্ত্বিক বিতর্ক। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তকদের বিশ্লেষণ এবং দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো আমাদের সামনে এক জটিল সমীকরণ তুলে ধরছে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের বৈধতা, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বা গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—সবই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ‘আন্তর্জাতিক’ সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন

জুলাই মাসের আন্দোলন ছিল মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি অহিংস আন্দোলন। তবে দ্রুতই তা এক দফায় রূপ নেয় এবং রাজপথে ব্যাপক রক্তপাত ঘটে। অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আন্দোলনে আন্তর্জাতিক শক্তি বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভিডিও বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল সময়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মেট্রোরেল বা সরকারি স্থাপনায় যে ধরনের পরিকল্পিত হামলা হয়েছে, তা কেবল সাধারণ আন্দোলনের অংশ হওয়া কঠিন।
বিদেশি সংবাদমাধ্যম, যেমন— ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা বা পশ্চিমা কিছু থিঙ্কট্যাংকও তখন প্রশ্ন তুলেছিল যে, বাংলাদেশের এই অস্থিতিশীলতার সুযোগে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে কি না। কার্জনের মতে, গণআন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নাশকতা দুটি ভিন্ন বিষয়। ১৯৬৯ বা ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে যে জনরোষ দেখা গিয়েছিল, তার সাথে ২০২৪-এর কিছু কিছু ঘটনার ধরণগত পার্থক্য রয়েছে যা গভীর তদন্তের দাবি রাখে।

ভূ-রাজনীতির ত্রিমুখী লড়াই: ভারত, চীন ও আমেরিকা

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান একে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। অধ্যাপক কার্জনের আলোচনায় উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের স্বার্থ সরাসরি জড়িত।

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা:

পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন চেয়েছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।

২. ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ:

বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৪০০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা মানেই তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা। অধ্যাপক কার্জনের মতে, ভারত বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট দলের চেয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থকেই বড় করে দেখে।

৩. চীন ও তুরস্ক ফ্যাক্টর:

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক (Turkey) এবং মোসাদ (Mossad) ফ্যাক্টর বাংলাদেশে আলোচিত হচ্ছে। তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা বা পাকিস্তানের প্রভাব নিয়েও নানা গুঞ্জন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান, তুরস্ক বা চীন মনে করতে পারে যে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট ধারার সরকার থাকলে তাদের স্বার্থ বেশি সুরক্ষিত হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট ও বর্তমান সংকট

৫ই আগস্টের পর ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিয়ে অধ্যাপক কার্জন বেশ কিছু কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তার মতে, জনগণ এই সরকারকে বসিয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ তৈরির জন্য। কিন্তু সরকার তার মূল ম্যান্ডেট থেকে সরে গিয়ে এমন কিছু কাজ করছে যা তাদের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অধ্যাপক কার্জন মনে করেন, বর্তমান সরকার কেবল ছাত্র এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর (মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি) সমর্থনে চলছে। তিনি এই সরকারকে ‘পার্টিজান’ বা পক্ষপাতদুষ্ট সরকার হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিজেই একটি নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং সংবিধান সংশোধনের নামে একে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। নির্বাচনের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা এবং ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার প্রচেষ্টা দেশের রাজনীতিতে একটি গভীর শূন্যতা (Political Vacuum) তৈরি করছে।

আইসিটি বিচার প্রক্রিয়া: প্রতিহিংসা নাকি ন্যায়বিচার?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) বিচার চলছে। অধ্যাপক কার্জন এই বিচার প্রক্রিয়াকে আইনের শাসনের চেয়ে ‘প্রতিহিংসার চূড়ান্ত মাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বেশ কিছু আইনি অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন:

গার্হস্থ্য অপরাধ বনাম আন্তর্জাতিক অপরাধ:

অধ্যাপক কার্জনের মতে, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো যদি অপরাধ হয়েও থাকে, তবে তা দেশীয় আইনে রেগুলার ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া উচিত ছিল। একে জোর করে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা আইনিভাবে দুর্বল।

রোম স্ট্যাটিউট-এর অপপ্রয়োগ:

তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) রোম স্ট্যাটিউটের দোহাই দিলেও তা সিলেক্টিভলি বা খণ্ডিতভাবে ব্যবহার করছে। রোম স্ট্যাটিউটে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছর হলেও বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ:

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতো সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টবি ক্যাডম্যানের মতো আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের সরে যাওয়াও এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের কারাবাস
অধ্যাপক কার্জন বর্তমান পরিস্থিতির একটি দুঃখজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, দেশে বর্তমানে জামিনের অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন যারা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা সত্ত্বেও কারাগারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন:

অধ্যাপক আবুল বারকাত: ৭০ বছর বয়সী এই অর্থনীতিবিদ সাত মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে। তার স্বাস্থ্য প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছে।

আসাদুজ্জামান নূর: ৮১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো অশীতিপর বৃদ্ধদের যেভাবে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে রাখা হয়েছে, তাকে অধ্যাপক কার্জন অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন।

সাবেক বিচারপতি খাইরুল হক: ৮০ বছর বয়সী একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাজনৈতিক রায়ের কারণে যেভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।

মজার বিষয় হলো, একই ট্রাইব্যুনাল থেকে দণ্ডিত মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ব্যক্তিকে অসুস্থতার কারণে জামিন দেওয়া হলেও, অন্যদের ক্ষেত্রে সেই মহানুভবতা দেখা যাচ্ছে না। এটি বিচার ব্যবস্থায় ‘দ্বিমুখী নীতি’র বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি মনে করেন।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ও রাজনৈতিক শূন্যতা

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন এবং বিশাল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তাকে অধ্যাপক কার্জন বিপজ্জনক মনে করেন। তিনি বলেন, একটি দল যারা দেশের ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে, তাদের রাজনীতি থেকে বাইরে রাখলে দেশে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা বা শূন্যতা তৈরি হবে। কোনো দল বা ব্যক্তির ভুল বা অপরাধের বিচার হতে পারে, কিন্তু পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা ফ্যাসিবাদেরই একটি নতুন রূপ। তিনি ড. ইউনূসের সরকারকে আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় ‘ফ্যাসিবাদী শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এক গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। কিন্তু অধ্যাপক কার্জনের বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বলছে, আমরা হয়তো এক ফ্যাসিবাদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে অন্য এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছি। ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের গুটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
একটি রাষ্ট্র তখনই সফল হয় যখন সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় এই সময়টিও কেবল একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক উৎসসমূহ (References)
মূল ভিডিও উৎস:
চ্যানেল: মানচিত্র (MANCHITRO)
আলোচনার বিষয়: ‘জুলাই আন্দোলনে আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা জড়িত ছিল’ — অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
লিঙ্ক: YouTube Video Link
প্রকাশের তারিখ: জানুয়ারি ২০২৬।

সহায়ক সংবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: বাংলাদেশের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মান এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও বিবৃতি (২০২৪-২৫)।
ভূ-রাজনীতি ও দক্ষিণ এশিয়া: ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ (The Diplomat) এবং ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্কের প্রভাব সংক্রান্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনসমূহ।
আইনি প্রেক্ষাপট: ‘রোম স্ট্যাটিউট’ (Rome Statute) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারিক নীতিমালা সংক্রান্ত দলিলাদি।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং অন্যান্য জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অধ্যাপক আবুল বারকাত, আসাদুজ্জামান নূর এবং সাবেক বিচারপতি খাইরুল হকের মামলা ও জামিন সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *