আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি অযাচিত হস্তক্ষেপ: ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটির সংজ্ঞা যেন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের কাছে বারবার হার মানছে। ল্যাটিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলা দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটনের চক্ষুশূল হয়ে আছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটকের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি তীব্র কম্পন সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় করা এই খবরটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদপত্র থেকে শুরু করে আল-জাজিরা, বিবিসি বা রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে। কিন্তু এই আটকের পেছনে পর্দার আড়ালে থাকা কারণগুলো কী? এটি কি সত্যিই কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের আরও একটি সুপরিকল্পিত ও অযাচিত হস্তক্ষেপ? এই নিবন্ধে আমরা সেই প্রেক্ষাপট ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব।

মাদুরো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের রসায়ন

নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাঁর বিরোধের শিকড় অনেক গভীরে। ২০১৩ সালে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই তিনি চাভেজের ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’ এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে আঁকড়ে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহসী নেতৃত্ব ওয়াশিংটন কখনোই পছন্দ করেনি।

ওবামা প্রশাসনের সময় থেকেই ভেনিজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই চাপ চরমে পৌঁছায় এবং বাইডেন প্রশাসনও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। গত এক দশকে মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নানা পথ অবলম্বন করেছে—কখনও বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, কখনও বা দেশটির ওপর কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আজকের এই আটকের ঘটনা সেই দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতারই একটি চূড়ান্ত পর্যায়।

আটকের নেপথ্যে: কোনো আইনি প্রক্রিয়া নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’ বা মাদক পাচারের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগ তুলে আসছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। কোনো একটি স্বাধীন দেশের আসীন প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি দেশ এভাবে আটক করা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

আটকের এই অভিযানে সরাসরি মার্কিন বিশেষ বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা ছিল বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা যাচ্ছে। যদি এটি কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করে ঘটানো হয়, তবে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধানরা কূটনৈতিক দায়মুক্তি ভোগ করেন, যা এখানে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি কেবল মাদুরোর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তেলের রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ

ভেনিজুয়েলা হলো বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুতধারী দেশ। পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটি সবসময়ই একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। মাদুরো সরকারের বড় অপরাধ ছিল তারা ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদকে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল এবং চীন ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছিল।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বর্তমান বিশ্ববাজারে জ্বালানির যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদুরোকে সরিয়ে একটি অনুগত সরকার বসাতে পারলে ওয়াশিংটন কেবল তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং দক্ষিণ আমেরিকায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাবকেও সমূলে উৎপাটন করতে পারবে। এই ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ মূলত গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে সম্পদের দখল নেওয়ার একটি পুরোনো খেলা মাত্র।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বিশ্ব যখন বিভক্ত

মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটকের পর বিশ্ব সম্প্রদায় স্পষ্টত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো, যারা এই পদক্ষেপকে ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে প্রচার করছে। অন্যদিকে, রাশিয়া, চীন, ইরান এবং কিউবার মতো দেশগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘দস্যুপনা’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই ঘটনা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের নেতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে কেউই নিরাপদ নয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমাননা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে, কারণ ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই ধরণের উদাহরণ মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।

মানবাধিকার বনাম পশ্চিমা দ্বিমুখী নীতি

যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই মাদুরোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, বিশ্বের অনেক দেশেই যখন একনায়কতন্ত্র চলে বা মানবাধিকার লুণ্ঠিত হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের মিত্র হয়, তবে ওয়াশিংটন সেখানে নীরব থাকে। ভেনিজুয়েলার ওপর বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ওষুধ ও খাবারের অভাবে ধুঁকছে। একে কি মানবাধিকার রক্ষা বলা যায়?

মাদুরোকে আটক করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই ভেনিজুয়েলার মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, নাকি নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায়—সেটি এখন বড় প্রশ্ন। একজন নির্বাচিত নেতাকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া কখনোই গণতন্ত্রের সমাধান হতে পারে না।

অভ্যন্তরীণ প্রভাব: ভেনিজুয়েলা কি গৃহযুদ্ধের দিকে?

প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের ফলে ভেনিজুয়েলার ভেতরে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাঁর অনুসারীরা রাস্তায় নেমে এসেছে এবং সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ এখনও মাদুরোর প্রতি অনুগত। এই পরিস্থিতিতে দেশটি একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা পুরো ল্যাটিন আমেরিকার স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেবে।

ইতিমধ্যেই কলম্বিয়া এবং ব্রাজিলের সীমান্তে শরণার্থী সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যখন কোনো বহিঃশক্তি কোনো দেশের সরকার ব্যবস্থাকে জোর করে ভেঙে দেয়, তখন সেখানে শান্তি আসার বদলে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়—যার বাস্তব উদাহরণ আমরা ইরাক ও লিবিয়াতে দেখেছি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার গুরুত্ব

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ভেনিজুয়েলার এই ঘটনাটি একটি বিশাল সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি যার, আইন তার—এই নীতিই যেন আবারও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে এই খবরের ব্যাপক কাটতি হওয়ার কারণ হলো, এদেশের মানুষও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি আজ ভেনিজুয়েলার সাথে এমনটা হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও পরাশক্তিগুলো এভাবেই হস্তক্ষেপ করবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশেও অযাচিত হস্তক্ষেপ করে প্রায় দেড় বছর আগে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল সাধারণ গণমানুষকে। তথাকথিত একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ব্যাক্তিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়েছে- যার কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে পুরো বাংলাদেশ আজ অস্থিতিশীল।

সুতরাং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলেও এটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, কীভাবে বৈশ্বিক মেরুকরণের এই যুগে একটি ছোট দেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে। এটি কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, বরং এটি বিশ্ব শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভয়াবহ হুমকি। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যা করছে, তা আসলে ক্ষমতার দাপট ছাড়া আর কিছুই নয়।

একটি দেশের শাসক কেমন হবে বা কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার কেবল সেই দেশের জনগণের। বহিরাগত কোনো শক্তির বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হলে তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী বা কল্যাণকর হয় না। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এই ঘটনার নিন্দা জানানো এবং একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনকে সমুন্নত রাখা। ভেনিজুয়েলা যেন কোনো পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি না হয়, বরং একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে—এটাই হোক আগামীর প্রত্যাশা। যুক্তরাষ্ট্রের এই অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে বিশ্বজুড়ে অরাজকতা বাড়বে এবং ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অযাচিত হস্তক্ষেপ করে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের আটকের এই ঘটনায়, আপনার মতামত বা প্রতিক্রিয়া কী তা কমেন্টে লিখুন। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

সম্পাদক, ব্যাঙেরছাতা ব্লগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *