জাতীয়

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন: একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আজ এক জটিল এবং অভূতপূর্ব মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একটি একরৈখিক শাসনব্যবস্থার পতনের পর, ছাত্র-জনতার “তথাকথিত” অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে মানুষের মনে সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা—গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি যে ‘নির্বাচন’, তা এবার কেমন হবে? আজ সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত জোবাইদা নাসরীনের “প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা পূরণ হবে?” শীর্ষক নিবন্ধটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে সাহসের সাথে তুলে ধরেছে। ১৭ বছর পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে রদবদল আমরা দেখছি, তা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তবে এই আকাঙ্ক্ষা কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণের পুরনো গ্যাঁড়াকলে আটকে যাবে, তা আজ এক গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তারেক রহমান ও বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্বাসন

আর্টিকেলটির একটি কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন। প্রায় দুই দশক প্রবাসে কাটানোর পর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির এই নেতার দিকে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশেষ নজর রয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম তাকে ইতিমধ্যে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিত্রায়িত করতে শুরু করেছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। তবে তারেক রহমানকে ঘিরে এই উন্মাদনা যেমন ইতিবাচক, তেমনি রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘ সময় পর দলে যে নতুন রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে, তার সাথে পুরনো ধারার রাজনীতির সমন্বয় ঘটানো বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা। জোবাইদা নাসরীনের লেখায় উঠে এসেছে যে, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী আমেজ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে রাজনীতির অলিগলিতে গুঞ্জন রয়েছে যে, এই জনপ্রিয়তাকে সংহত করতে বিএনপিকে অন্যান্য দলের সাথে কৌশলগত সমীকরণে যেতে হতে পারে।

জোটবদ্ধ রাজনীতির নয়া মেরুকরণ: এনএসপি ও জামায়াত প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ‘জোট’ সবসময়ই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে এবারের সমীকরণটি বেশ বিচিত্র। ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার নির্বাচনী জোট এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এনএসপি আগে ১২টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও এখন তারা জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি কোনো আদর্শগত মেলবন্ধন নয়, বরং একটি ‘নির্বাচনী কৌশল’। কিন্তু এই যুক্তি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নিয়ে জোরালো সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাতের কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই জোট নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। এনএসপি-র ভেতরে থাকা প্রগতিশীল বা নারী নেত্রীদের একটি বড় অংশ জামায়াতের সাথে এই গাঁটছড়া মেনে নিতে পারছেন না, যা নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

বর্জন ও অনীহার রাজনীতি: কারা থাকছে না নির্বাচনে?

একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো সব পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা এক ধরনের ‘অনীহার রাজনীতি’ লক্ষ্য করছি। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ইনকিলাব মঞ্চের মতো অনেক সংগঠন নির্বাচন থেকে দূরে থাকার কথা বলছে। এর পাশাপাশি ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতিও নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারিগর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বা মাহফুজ আলমের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরাও নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। যখন এতগুলো রাজনৈতিক পক্ষ এবং জনমতের প্রতিনিধিরা নির্বাচনের মাঠ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, তখন সেই নির্বাচনকে কতটুকু ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলা যাবে, তা বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট

নির্বাচনী ময়দানে উত্তাপ থাকলেও ভোটারদের মনে রয়েছে এক চাপা উদ্বেগ। জোবাইদা নাসরীন তার কলামে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এই প্রশ্নটি তুলেছেন যে, প্রার্থীদের জন্য ব্যক্তিগত গানম্যান নিয়োগ বা অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়াই কি একটি নিরাপদ নির্বাচনের নিশ্চয়তা? একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল প্রার্থীর নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়, বরং ভোটারদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন যেখানে তারা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই কেন্দ্রে যেতে পারবেন। বিগত নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ভোট দিতে পারা’ নিয়ে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা “অস্বাভাবিক” এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি ভোটাররা মনে করেন যে তাদের ভোট দেওয়ার পরিবেশ নেই অথবা ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত, তবে তারা ভোটকেন্দ্র বিমুখ হতে পারেন, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও মার্কিন কংগ্রেসের চিঠি

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক প্রভাব কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে এবার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের পাঁচজন সদস্যের পক্ষ থেকে ইউনূসকে লেখা চিঠিটি নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এই চিঠিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা এবং ভোটারদের একটি বিশাল অংশ—যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক—তারা ভোটাধিকার বঞ্চিত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগের বিষয়টি চিঠিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এই আন্তর্জাতিক চাপ সরকারকে যেমন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনে বাধ্য করছে, তেমনি নির্বাচনী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো যখন কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে সরাসরি মতামত দেয়, তখন তা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে।

আসন ভাগাভাগি: পর্দার পেছনের গোপন সমঝোতা?

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘আসন ভাগাভাগি’র সংস্কৃতি। রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্য বাগযুদ্ধ চললেও পর্দার আড়ালে বড় দলগুলো যখন নিজেদের মধ্যে আসন ভাগ করে নেয়, তখন সাধারণ ভোটারের ভোটাধিকার মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং তারেক রহমানের সাথে জামায়াতের গোপন বৈঠকের গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাউর। সমালোচকরা মনে করছেন, বড় দলগুলো যদি আগেই কে কোন আসনে জয়ী হবে তা ঠিক করে ফেলে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে আশার কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল একটি নাটক হিসেবে পর্যবসিত হবে। জোবাইদা নাসরীন তার লেখায় এই গুঞ্জনটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ এটি ভোটারদের আস্থার মূলে আঘাত করে।

নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তুতি

নির্বাচনের তারিখ হিসেবে ১২ই ফেব্রুয়ারি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছ ভোটার তালিকা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কেবল তারিখ ঘোষণা যথেষ্ট নয়, বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতন্ত্রের রদবদল থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পর্যন্ত—সব জায়গায় যদি নিরপেক্ষতা বজায় না থাকে, তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে যায়। সরকারের ওপর এখন দ্বিমুখী চাপ—একদিকে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর, অন্যদিকে সব রাজনৈতিক দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা।

নির্বাচন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা

বর্তমান যুগে রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যম। তবে এই প্লাটফর্মগুলো এখন কেবল প্রচারণার নয়, বরং গুজব এবং পাল্টাপাল্টি আক্রমণের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। জোবাইদা নাসরীন লক্ষ্য করেছেন যে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের বিতর্ক চলছে, তা জনগণের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সাইবার প্রচারণার এই যুগে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের জন্য নতুন এক ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

চ্যালেঞ্জ জয় করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি জাতির আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা। জোবাইদা নাসরীনের নিবন্ধটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা পূরণ হওয়া না হওয়া নির্ভর করছে অনেকগুলো ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র ওপর। যদি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থকে স্থান দেয়, যদি ভোটারদের মনে পূর্ণ নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং যদি আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করা যায়, তবেই কেবল এই নির্বাচনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

অন্যথায়, আমরা যদি আবার সেই পুরনো আসন ভাগাভাগি বা বর্জনের রাজনীতিতে ফিরে যাই, তবে দেশ ও জাতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়বে। এই সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও চরমভাবে ব্যাহত করবে। বাংলাদেশের মানুষ আজ এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় আছে, যেখানে তাদের একটি ভোটই হবে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক। সেই সোনালী দিনের প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে ষোলো কোটি মানুষ। গণতন্ত্রের এই অগ্নিপরীক্ষায় আমরা জয়ী হব কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

সামগ্রিক নির্বাচনী কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে আপনার মতামত কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *