
বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান। মা হওয়া প্রতিটি নারীর জীবনে এক অনন্য অনুভূতি এবং নতুন প্রাণের আগমন একটি পরিবারের জন্য শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আনন্দ আজ এক চরম উৎকণ্ঠা আর ব্যবসায়িক মারপ্যাঁচের জালে বন্দি হয়ে পড়েছে। এক সময় সন্তান জন্মদান ছিল একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা আজ ‘অপারেশন থিয়েটার’ আর ‘ছুরি-কাঁচি’র কৃত্রিমতায় পর্যবসিত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন বা সিজার এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, একটি দেশে মোট প্রসবের মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সিজার হওয়া যৌক্তিক, সেখানে বাংলাদেশে এই হার সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫০ শতাংশের উপরে এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে তা ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই ‘গণহারে সিজার’ কি সত্যিই চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি, নাকি একটি পরিকল্পিত বাণিজ্য? আজ সময় এসেছে এই প্রশ্নটি তোলার এবং এর গভীর সংকটগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করার।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশুই জন্ম নিচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। অর্থাৎ, প্রতি দু’জন শিশুর একজন সিজারে জন্ম নিচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে স্বাভাবিক প্রসব যেন এক রূপকথার গল্প। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে সিজারের হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমেরিকার মতো উন্নত দেশে যেখানে স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা অনেক বেশি, সেখানেও সিজারের হার প্রায় ৩২ শতাংশ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এই হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার আকাশচুম্বী হওয়ার বিষয়টি কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং এক প্রকার জনস্বাস্থ্যের ওপর জুলুম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান: ভয় এবং বাণিজ্যের এক বিষাক্ত চক্র
কেন বাংলাদেশে গণহারে সিজার বাড়ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি বিষয় সামনে আসে: ‘ভয়’ এবং ‘বাণিজ্য’। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে গর্ভবতী মা এবং তাদের পরিবারের মধ্যে এক ধরনের ‘ফিয়ার সাইকোসিস’ বা ভীতি কাজ করে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো পরিকল্পিতভাবে নরমাল ডেলিভারিকে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। পরিবারের সদস্যদের বোঝানো হয় যে, একটু দেরি করলে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে বা মা অসহ্য কষ্ট পাবেন। এই মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিজারকে একমাত্র ‘নিরাপদ’ সমাধান হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, হাসপাতালের জন্য সিজার মানেই নিশ্চিত বাণিজ্য। একটি সিজারিয়ান অপারেশনের প্যাকেজে অপারেশন চার্জ, কেবিন ভাড়া, ওষুধের খরচ এবং সার্জনের ফি মিলিয়ে হাসপাতালগুলোর বড় অংকের মুনাফা থাকে। এর বিপরীতে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য একজন চিকিৎসক বা নার্সকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ব্যস্ত চিকিৎসকরা করতে চান না। দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করা এবং নিশ্চিত আয়ের নেশায় সিজারকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র এই অপ্রয়োজনীয় সিজারের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশিদের পকেট থেকে ৫০০০ কোটি টাকারও বেশি গচ্ছা যাচ্ছে।
প্রকৃতির আশীর্বাদ বনাম সিজারের ঝুঁকি
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশু যখন মায়ের জরায়ু পথ দিয়ে আসে, তখন সে মায়ের শরীর থেকে কিছু বিশেষ উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা ‘মাইক্রোবায়োম’ পায়। চিকিৎসকরা একে শিশুর জীবনের প্রথম ‘প্রাকৃতিক টিকা’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিজারে জন্ম নেওয়া শিশুরা এই জন্মগত আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।
এছাড়া, স্বাভাবিক প্রসবের প্রক্রিয়ায় শিশুর ফুসফুসের ভেতরকার জলীয় অংশ প্রাকৃতিকভাবে বেরিয়ে যায়, যা তাকে জন্মের পর শ্বাস নিতে সাহায্য করে। সিজারে জন্মানো শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদী অ্যালার্জি বা হাঁপানির ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এমনকি অপারেশন টেবিলে জন্মের পরপরই মায়ের বুকে শিশুকে দেওয়া বা ‘স্কিন টু স্কিন কন্টাক্ট’ অনেক সময় সম্ভব হয় না, যা শিশুর মানসিক বিকাশ ও মায়ের বুকের দুধ পানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মায়েদের ক্ষেত্রেও সিজার কোনো সহজ বিষয় নয়। এটি একটি বড় ধরনের সার্জারি। এর ফলে পরবর্তীতে হার্নিয়া, জরায়ু ও মূত্রথলির জটিলতা এবং পরবর্তী গর্ভধারণে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সিজারের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং মায়ের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক হতে অনেক দেরি হয়।
জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিফলন
বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকাগুলোতেও এই সংকট নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একটি স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে গত এক দশকে সিজারের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, দক্ষ মিডওয়াইফ বা ধাত্রীর অভাব এবং সিজার নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যথাযথ তদারকি না থাকায় ক্লিনিকগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, এটি কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে’ পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করছে।
বিদেশি মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিবিসি ও আল জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের এই সিজার বাণিজ্য নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে সিজার বাড়লেও বাংলাদেশের মতো এত দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে তা কোথাও বাড়েনি। আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য গবেষকরা মনে করেন, পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো এবং চিকিৎসকদের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না করলে এই মহামারি রোধ করা কঠিন।
উত্তরণের পথ: আমরা কী করতে পারি?
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা প্রসবপূর্ব কাউন্সিলিং এবং যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিজারের হার ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪২ শতাংশে নিয়ে এসেছে। এখান থেকে আমরা কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের কথা ভাবতে পারি:
১. সচেতনতা বৃদ্ধি:
গর্ভবতী মা ও তার পরিবারকে বোঝাতে হবে যে প্রসব বেদনা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং এর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। নরমাল ডেলিভারির উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
২. মিডওয়াইফারি ব্যবস্থার উন্নয়ন:
দক্ষ ধাত্রী বা মিডওয়াইফরা স্বাভাবিক প্রসবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। চিকিৎসকদের ওপর চাপ কমাতে এবং স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত মিডওয়াইফ নিয়োগ করা জরুরি।
৩. সরকারি নজরদারি ও নীতিমালা:
বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে কেন সিজার করা হচ্ছে, তার যথাযথ অডিট হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি সিজারের জন্য চিকিৎসকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনীয় সিজারের জন্য হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. ব্যয় নিয়ন্ত্রণ:
স্বাভাবিক প্রসব এবং সিজারের মধ্যকার ব্যয়ের ভারসাম্য আনতে হবে যাতে হাসপাতালগুলো কেবল লাভের আশায় সিজারের দিকে না ঝোঁকে।
সন্তান জন্মদান প্রকৃতির এক অনন্য ও মহান প্রক্রিয়া। একে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানিয়ে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্বল করে দিচ্ছি। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে হয়তো হাসপাতালের ৯০ শতাংশ শিশুই জন্ম নেবে ছুরি-কাঁচির নিচে। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির মেধা ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত।
একজন সচেতন নাগরিক এবং ব্লগার হিসেবে আমার দায়িত্ব এই সত্যগুলো আপনার সামনে তুলে ধরা। আসুন, আমরা সিজার বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। চিকিৎসকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, আপনারা বাণিজ্যের আগে মানবতাকে স্থান দিন। আর মায়েদের প্রতি আহ্বান, ভয়কে জয় করে প্রকৃতির ওপর আস্থা রাখুন। একটি সুস্থ মা এবং একটি শক্তিশালী শিশুর জন্য স্বাভাবিক প্রসবের কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই প্রতিটি শিশু সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসুক, প্রকৃতির আশীর্বাদ নিয়ে বড় হোক। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই অপ্রয়োজনীয় সিজারের মহামারি রুখতে এবং একটি সুস্থ ও সবল জাতি গড়ে তুলতে।
পৃথিবীর সকল মা এবং নবজাতক সুস্থ থাকুক—এই আমাদের একমাত্র চাওয়া।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ
১. ভিডিও তথ্যসূত্র (Primary Source):
শিরোনাম: গণহারে সিজার সর্বনাশ দেখছে বাংলাদেশ! (Massive C-section Crisis in Bangladesh)
প্রকাশক: The Press (ইউটিউব চ্যানেল)
প্রকাশের তারিখ: ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬
২. আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা:
World Health Organization (WHO): সিজারিয়ান সেকশন রেট সংক্রান্ত গাইডলাইন (১০-১৫% আদর্শ হার)।
UNICEF Bangladesh: মাতৃস্বাস্থ্য এবং নবজাতকের যত্ন বিষয়ক বার্ষিক পরিসংখ্যান রিপোর্ট।
BDHS (Bangladesh Demographic and Health Survey): বাংলাদেশে প্রসবকালীন অস্ত্রোপচারের সাম্প্রতিক হার ও প্রবণতা বিষয়ক প্রতিবেদন।
৩. সাক্ষাৎকার ও বিশেষজ্ঞ মতামত (ভিডিও থেকে প্রাপ্ত):
অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম: বিভাগীয় প্রধান (ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রী রোগ বিভাগ), আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল ডাটা: কাউন্সিলিং ও অডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে সিজার কমানোর সফল কেস স্টাডি।
৪. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম:
প্রথম আলো/দ্য ডেইলি স্টার: বাংলাদেশে সিজারিয়ান বাণিজ্যের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
BBC News (Bengali): “বাংলাদেশে কেন সিজারের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে?” শীর্ষক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন।
এই ওয়েবসাইটের বিভিন্ন আর্টিকেলের মধ্যে আপনার পন্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে যোগাযোগ করুন: salihaali624@gmail.com