বাংলাদেশ থেকে ভেনিজুয়েলা: যেখানেই নোবেল শান্তি বিজয়ী- সেখানেই অশান্তি আর ষড়যন্ত্র
ভূ-রাজনীতির নতুন দাবাখেলা: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান এবং নোবেলজয়ীদের বিতর্কিত ভূমিকা
২০২৬ সালের ৩রা জানুয়ারি। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন এক অভাবনীয় সামরিক অভিযানে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের একটি চৌকস দল অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। এই ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল মহাপ্রলয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার ২.০’ নীতির এই চরম পরিণতি বিশ্বজুড়ে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রশ্ন উঠেছে সার্বভৌমত্ব নিয়ে, তেলের রাজনীতি নিয়ে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—নোবেলজয়ীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে ভেনেজুয়েলা, মায়ানমার থেকে আফগানিস্তান—যেখানেই নোবেলজয়ীরা রাজনীতির মূল ধারায় সক্রিয় হয়েছেন, সেখানেই কি ষড়যন্ত্র আর দেশের পতন অনিবার্য? আজকের এই বিশদ বিশ্লেষণে আমরা এই জটিল সমীকরণগুলো উন্মোচনের চেষ্টা করব।
কারাকাসের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ৩০ মিনিট
শনিবার ভোর রাত ঠিক ২টা। কারাকাসের আকাশে হঠাৎ করেই লো-ফ্লাইং এয়ারক্রাফট আর ড্রোনের গর্জন শোনা যায়। মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ‘ডেল্টা ফোর্স’ এবং ১৬০তম স্পেশাল অপারেশন এভিয়েশন রেজিমেন্ট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাদুরোর বাসভবন মিরা ফ্লোরেস প্রাসাদের সুরক্ষা বলয় ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। পুরো অভিযানটি স্থায়ী ছিল মাত্র ৩০ মিনিটেরও কম সময়। মার্কিন বিচার বিভাগ দাবি করেছে, মাদুরো কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান নন, বরং তিনি আন্তর্জাতিক মাদক সাম্রাজ্যের সম্রাট। তাকে আটকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবরটি বিশ্বকে জানান। অথচ আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্লেষকগণ বলছেন, একটি স্বাধীন দেশের ভেতরে ঢুকে এভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া আধুনিক যুগে এক বিরল ও বিতর্কিত ঘটনা।
নারকোটেররিজম বনাম তেলের রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে ধরার জন্য যে আইনি ঢাল ব্যবহার করেছে তার নাম ‘নারকোটেররিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসবাদ। তাদের দাবি, মাদুরো গত ২০ বছর ধরে কলম্বিয়ার বিপ্লবী গোষ্ঠী এফএআরসি-র (FARC) সাথে হাত মিলিয়ে একটি ড্রাগ কার্টেল পরিচালনা করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মাদকের এই অভিযোগটি কেবল একটি ‘স্মোক স্ক্রিন’ বা ধোঁয়াসা। আসল লক্ষ্য হলো কারাকাসের তেল দখল করা।
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদের মালিক। সৌদি আরব বা ইরানের চেয়েও বেশি তেল রয়েছে এই দেশটিতে। ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করবেন এবং ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে মার্কিন পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ পূরণ করবেন, তখনই তেলের গন্ধটা পরিষ্কার হয়ে যায়। অরিনোকো অয়েল বেল্ট এবং সেখানকার খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
নোবেলজয়ী ও ষড়যন্ত্রের নতুন সমীকরণ
এই অভিযানের পেছনে কেবল মাদক বা তেল নয়, বরং ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার মসনদে একজন ‘বন্ধু’ বসানোর পরিকল্পনাও স্পষ্ট। আর সেই সম্ভাব্য নাম হলো ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। এখানেই বাংলাদেশ বা মায়ানমারের মতো দেশগুলোর সাথে ভেনেজুয়েলার একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা যখন নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন বা বিদেশি শক্তির সাহায্য কামনা করেন, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে। মাচাদো দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর সম্প্রতি নরওয়েতে পালিয়ে যান এবং ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতির কট্টর সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি একাধিকবার বলেছেন যে মাদুরোকে সরাতে সামরিক হুমকি প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা অং সান সু চির রাজনৈতিক উত্থান ও পতনের ইতিহাসকে। যখনই কোনো নোবেলজয়ী বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখনই সেই দেশে চরম বিশৃঙ্খলা বা শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: পানামা থেকে ভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলার এই ঘটনাটি ১৯৮৯-৯০ সালের পানামা অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। ৩৬ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ৩রা জানুয়ারি মার্কিন বাহিনী পানামায় ঢুকে ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে একইভাবে তুলে এনেছিল। অবাক করা বিষয় হলো, মাদুরোও গ্রেপ্তার হলেন ২০২৬ সালের একই তারিখ অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারি। নরিয়েগাও একসময় সিআইএর বন্ধু ছিলেন, কিন্তু যখনই তিনি মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, তখনই তাকে ‘মাদক সম্রাট’ আখ্যা দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো। পানামা এবং ভেনেজুয়েলার এই দুটি অভিযানের কৌশল ও অভিযোগের ধরন প্রায় হুবহু এক। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা যে, যারা মার্কিন হুকুম মানবে না, তাদের পরিণতি নরিয়েগা বা মাদুরোর মতোই হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ও বিভক্ত বিশ্ব
মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিশ্ব এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা একে স্বাগত জানাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং কিউবা একে নগ্ন আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করেছে। রাশিয়ার জন্য ভেনেজুয়েলা ছিল ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় কৌশলগত মিত্র। সেখানে তাদের হাজার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। চীনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, কারণ ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ ভেনেজুয়েলা থেকে আসার কথা ছিল।
জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখানে ‘আত্মরক্ষা’ বা ‘মাদক পাচার রোধ’ এর যুক্তি দিলেও আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানদের যে ‘ইমিউনিটি’ বা বিচার বিভাগীয় অব্যাহতি থাকে, তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
মোনরো ডকট্রিন ও আগামীর ভেনেজুয়েলা
অনেকে ট্রাম্পের এই নতুন পররাষ্ট্র নীতিকে ‘ট্রনরো ডকট্রিন’ (ট্রাম্প + মোনরো) বলে অভিহিত করছেন। ১৮২৩ সালের মোনরো ডকট্রিনকে আরো আক্রমণাত্মকভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যার মূল কথা হলো পশ্চিম গোলার্ধে কেবল আমেরিকার হুকুম চলবে। তবে এই বিজয় কতটুকু দীর্ঘস্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় আছে। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী যদি গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে, তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো যুক্তরাষ্ট্র সেখানে এক দীর্ঘমেয়াদী চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি কীভাবে আন্তর্জাতিক লবিস্ট এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করা হয়। নোবেলজয়ীদের ভাবমূর্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক সময় একটি দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা চলে। ভেনেজুয়েলার ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জাতীয় ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বিদেশি শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বিপজ্জনক হতে পারে।
নিকোলাস মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে। কারাকাসের রাস্তায় এখন ট্যাঙ্কের গর্জন আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কেউ হয়তো ভাবছে মুক্তি এসেছে, আবার কেউ ভাবছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কি আর শান্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব? ভূ-রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই স্বার্থের নাম হলো ‘কালো সোনা’ বা তেল। মাদুরো হয়তো সেই সোনার খনির এমন এক পাহারাদার ছিলেন যিনি পাহারায় ভুল করেছিলেন, যার মাসুল তাকে এখন মার্কিন আদালতের কাঠগড়ায় দিতে হচ্ছে। আর বিশ্ববাসীর জন্য শিক্ষা হলো—নোবেল শান্তি পুরস্কার কিংবা বিদেশি সমর্থন কোনোটিই একটি দেশের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না, যদি না সেই দেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় সংহতি বজায় থাকে।
নিকোলাস মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে। কারাকাসের রাস্তায় এখন ট্যাঙ্কের গর্জন আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কেউ হয়তো ভাবছে মুক্তি এসেছে, আবার কেউ ভাবছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কি আর শান্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব? ভূ-রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই স্বার্থের নাম হলো ‘কালো সোনা’ বা তেল। মাদুরো হয়তো সেই সোনার খনির এমন এক পাহারাদার ছিলেন যিনি পাহারায় ভুল করেছিলেন, যার মাসুল তাকে এখন মার্কিন আদালতের কাঠগড়ায় দিতে হচ্ছে। আর বিশ্ববাসীর জন্য শিক্ষা হলো—নোবেল শান্তি পুরস্কার কিংবা বিদেশি সমর্থন কোনোটিই একটি দেশের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না, যদি না সেই দেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় সংহতি বজায় থাকে।
তথ্যসূত্র:
News Analysis by Kazi Runa: “বাংলাদেশ থেকে ভেনেজুয়েলা : যেখানেই নোবেলজয়ী, সেখানেই কি ষড়যন্ত্র আর দেশের পতন ?”
International Law on Sovereignty and Immunity.
Historical Comparison: Operation Just Cause (Panama, 1989).
